ইরানের শাসনব্যবস্থা কি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে

ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ক্রমেই রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য সাড়ে ১৪ লাখে পৌঁছায়। মাত্র এক বছর আগেও এই হার ছিল প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার। আমদানি নির্ভর দেশ ইরানে মুদ্রার এমন অবমূল্যায়নের প্রভাব সরাসরি পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। শুক্রবার পর্যন্ত চলমান সহিংসতায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সহিংসতার পর ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে উঠে আসে ‘স্বৈরাচারের পতন হোক’-যা সরকারের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকটের বাইরে রাজনৈতিক ক্ষোভ

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক সংকট একটি বড় কারণ হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়। ডয়চে ভেলের বরাতে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, দমননীতি এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতি ক্ষোভ এই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার আইনজীবী গিসসু নিয়ার মতে, অর্থনৈতিক ধস আন্দোলনের সূচনা ঘটালেও বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ও দাবিদাওয়ার ধরন ইঙ্গিত দিচ্ছে শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর অনাস্থার। তিনি বলেন, আগের আন্দোলনগুলোতে সংস্কারের দাবি থাকলেও এবার সরাসরি শাসনব্যবস্থাই লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

বিক্ষোভে আবারও শোনা যাচ্ছে ‘জান, জেন্দেগি, আজাদি’- নারী, জীবন ও স্বাধীনতা-স্লোগানটি, যা ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। একই সঙ্গে ‘ডেথ টু দ্য ডিক্টেটর’ স্লোগান শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে ক্ষোভের স্পষ্ট প্রকাশ।

বাজার ও ব্যবসায়ীদের অবস্থান

চলমান আন্দোলনে ইরানের বাজার ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ঐতিহাসিকভাবে ইরানের বাজার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবেও বাজারের ধর্মঘট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

গিসসু নিয়ার মতে, বাজারে ধর্মঘট শুধু অর্থনীতিতে নয়, বরং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রক্ষণশীল শক্তির ভিতেও আঘাত হানছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও স্বীকার করেছেন, সংকট সমাধান না হলে সরকার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে- যা অনেকের চোখে রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রকাশ।

নাগরিক জীবনে গভীর প্রভাব

অর্থনৈতিক সংকটে মানুষের সঞ্চয়ের মূল্য কমে গেছে। খাদ্য ও ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। এই সংকট শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও চাপে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যখন মানুষের হারানোর কিছু থাকে না, তখন তারা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মুখেও রাস্তায় নামতে দ্বিধা করে না। এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ বাড়ছে। লেবানন, ইয়েমেন ও গাজায় ইরানের অর্থনৈতিক সহায়তার বিপরীতে দেশের ভেতরের সংকট বিক্ষোভকারীদের আরও ক্ষুব্ধ করছে।

দমননীতি ও আন্তর্জাতিক চাপ

সরকার বিক্ষোভ দমাতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। টিয়ার গ্যাস ও গুলিবর্ষণের অভিযোগও উঠেছে। ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এমন দমনমূলক কৌশল আসলে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের অভাবকেই তুলে ধরছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপে প্রস্তুত। এর পাল্টা জবাবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যেকোনো হস্তক্ষেপের কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সব মিলিয়ে ইরানে চলমান আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীর রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকার এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে কি না, নাকি পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত আকার নেবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।