বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মাটি সোনার মতো উর্বর, নদী-খাল-বিলে ভরা, বৃষ্টিতে ধোয়া সবুজের সমারোহ। এই সবুজের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি কৃষি। অর্থনীতির মেরুদণ্ড যদি কৃষি হয়, তবে কৃষির মেরুদণ্ড কৃষক। যে কৃষক ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামেন, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ফসল ফলান, ঘাম ঝরিয়ে দেশের মানুষের পেট ভরান। কিন্তু তার কপালে যেন কষ্ট লেখা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যিনি ফসল ফলান, তিনি প্রায়ই সেই ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। আবার যিনি সেই ফসল কিনে খাচ্ছেন, শহরের সাধারণ ভোক্তা, তাকেও বাজারে গিয়ে চড়া মূল্য দিতে হয়। একজনের ঘাম শুকায় না, অন্যজনের পকেট খালি হয় এই অদ্ভুত সমীকরণই বাজার ব্যবস্থার করুণ চেহারা। মাঝখানে তৈরি হয় এক বিশাল ব্যবধান। এই ব্যবধানের নাম মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদার, মজুদদার, সিন্ডিকেট। এর সঙ্গে যোগ হয়, পরিবহন খরচের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। একদিকে মাঠে পেঁয়াজ পচে, অন্যদিকে বাজারে পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া। একদিকে আলু ফেলে দিতে হয়, অন্যদিকে আলুর কেজি পঞ্চাশ টাকা ছাড়ায়। এই দুঃখ চক্র ভাঙতে না পারলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এমনকি জাতীয় অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই কৃষক ও ভোক্তা এই দুই পক্ষের স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়া জাতীয় কর্তব্য।
কৃষকের স্বার্থ আসলে কী? খুব সহজ কথায় বলতে গেলে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য, উৎপাদন খরচ ওঠার নিশ্চয়তা, সময়মতো বীজ-সার-কীটনাশকের সহজলভ্যতা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারি সহায়তা এবং বাজারে প্রতারিত না হওয়া। আর ভোক্তার স্বার্থ? ন্যায্যমূল্যে নিরাপদ, পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত খাদ্য। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই উল্টো। কৃষক যখন আমন ধান বিক্রি করেন মণপ্রতি ১১০০-১২০০ টাকায়, তখন সেই ধান থেকে চাল হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় ৭০-৮৫ টাকা কেজি দরে। এক মণ ধান থেকে প্রায় ৪০ কেজি চাল হয় অর্থাৎ কৃষক পান ১২০০ টাকা, ভোক্তা দেন ৩০০০ টাকারও বেশি। মাঝের এই বিশাল লাভ কার পকেটে যায়? কৃষকের নয়, ভোক্তারও নয়। তাই বলা যায়, কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ একই সুতোয় গাঁথা একজনের লাভ মানেই, অন্যজনের স্বস্তি।
আমন মৌসুম এলেই, ধানের দামে ধস নামে। কৃষকের কাছে মজুদ রাখার গুদাম নেই, ব্যাংকঋণের কিস্তি শোধ করতে হয়, পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে তারা ফড়িয়া বা আড়তদারের কাছে, কম দামে বিক্রি করেন। তাতে উৎপাদন খরচও ওঠে না। বর্ষাকালে যখন সবজি উৎপাদন বেশি হয়, তখন দাম এত কমে যায় যে কৃষক মাঠ থেকে ফসল তুলে রাস্তায় ফেলে দেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই একই গল্প। এক বছর দাম আকাশছোঁয়া, পরের বছর উৎপাদন বেড়ে গেলে কৃষক নিঃস্ব। এই চরম অস্থিরতা কৃষিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পরিণত করেছে। ফলে গ্রামের তরুণরা আর বাবার পেশায় আসতে চান না। তারা শহরে গিয়ে রিকশা চালাতে রাজি, গার্মেন্টসে কাজ করতে রাজি কিন্তু মাটির সঙ্গে বাঁধা পড়তে চান না। এটা কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটা জাতির ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। অন্যদিকে রয়েছে শহরের সাধারণ মানুষের জীবন। একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর মাসিক বেতনের প্রায় অর্ধেকই চলে যায়, খাদ্য কেনাকাটায়। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মাছ-মাংস প্রতিটি জিনিসের দাম কখনো স্থির থাকে না। রমজান এলেই যেন সিন্ডিকেট জেগে ওঠে প্রবল পরাক্রমে। এক রাতের ব্যবধানে ছোলার দাম দ্বিগুণ, খেজুর-চিনি-তেলের দাম আকাশ স্পর্শ করে। টিসিবির ট্রাকের সামনে, সাধারণ মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন। অথচ একই সময়ে গ্রামে সেই পেঁয়াজ, আলু, সবজি কৃষকের গোলায় পড়ে থাকে ক্রেতার অভাবে। এই দ্বৈত চিত্র আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা ও অদক্ষতাকেই প্রকাশ করছে। একদিকে উৎপাদক কাঁদেন, ভোক্তা কাঁদেন মাঝখানে মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী হাসেন। এই অন্যায্য বণ্টন ব্যবস্থার অবসান কবে হবে? কৃষক ও ভোক্তা দুজনের স্বার্থই এখন একইসঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে। আর বিলম্ব করার সময় নেই। এটা আমাদের সবার বেঁচে থাকার লড়াই। এই সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না, তবে কিছু পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া যেতে পারে : ১. বর্তমানে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অধীনে ৪১টি জেলায় ‘কৃষকের বাজার’ চালু আছে। এই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী কৃষকের বাজার গড়ে তুলতে হবে। সপ্তাহে কমপক্ষে দু-তিন দিন এই বাজার চালু রাখতে হবে। শুধু সবজি-ফল নয়, চাল, ডাল, ডিম, মাছ, মুরগি সবকিছুর জন্য কৃষক নিজে এসে বিক্রি করবেন, মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের কৃষকের বাজারে দেখা গেছে, খুচরা বাজারের তুলনায় সবজির দাম ৩৫-৪৫ শতাংশ কম ছিল, আবার কৃষকও লাভ পেয়েছেন ২০-৩০ শতাংশ বেশি। এই মডেলকে যদি প্রতি উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে চালানো হয়, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। ২. বাংলাদেশে আলু উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন, কিন্তু কোল্ড স্টোরেজ আছে মাত্র ৬০ লাখ টনের। পেঁয়াজ-রসুনের অবস্থা আরও খারাপ। ফলে প্রতিবছর লাখ লাখ টন পণ্য নষ্ট হয় বা কৃষককে ফেলে দিতে হয়। সরকার যদি বেসরকারি খাতকে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে এবং সহজ ঋণের ব্যবস্থা করে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে উৎসাহিত করে, তাহলে আগামী ৩-৪ বছরে আরও ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব।
৩. ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) কার্যকর করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সরকার কিছু নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের জন্য একটি ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দেয়। যাতে বাজারে দাম পড়ে গেলেও, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের জন্য এই ন্যূনতম মূল্যটি নিশ্চিতভাবে পায়। এতে লাভ কম হলেও, তারা ক্ষতিতে পড়বে না। এটি কৃষকদের উৎপাদন উৎসাহিত করবে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পেতে নিশ্চয়তা থাকবে। ভারতের কিছু রাজ্যে ধান-গমের জন্য এমএসপি আছে। বাংলাদেশেও অন্তত প্রধান ফসলের জন্য সরকারি ক্রয়মূল্য ঘোষণা করে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করতে হবে। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে। ৪. পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। গ্রাম থেকে শহরে পণ্য আনতে যে পরিবহন খরচ হয়, তা অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও বেশি। গ্রাম থেকে ঢাকায় এক টন সবজি আনতে পরিবহন খরচ ৪০০০-৬০০০ টাকা। রেলে এই খরচ মাত্র ৮০০-১২০০ টাকা। রেলের মালবাহী সার্ভিস জোরদার এবং নদীপথে কার্গো চালু করলে, খরচ ৫০ শতাংশ কমবে। সুতারাং রেলপথ ও নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। ৫. সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন জোরদার করা যেতে পারে। বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদক সমবায় ইউনিয়ন (মিল্কভিটা) প্রমাণ করেছে সমবায়ভিত্তিক কাজ সফলতা আনে। ২০২৪ সালে মিল্কভিটা খামারিদের কাছ থেকে গড়ে লিটারপ্রতি ৫৫ টাকায় দুধ কিনেছে, যেখানে বাজারে খামারি পান ৩৫-৪০ টাকা। একইভাবে প্রতি জেলায় ‘চালভিটা’, ‘সবজিভিটা’, ‘মাছভিটা’ গড়ে তোলা যায়। কৃষকরা সমবায়ে যোগ দিয়ে একসঙ্গে উৎপাদন করবেন, প্রক্রিয়াকরণ করবেন, ব্র্যান্ডিং করবেন এবং সরাসরি বিক্রি করবেন। এতে তারা দর কষার ক্ষমতা পাবেন, মধ্যস্বত্বভোগী বাদ পড়বে। ৬. বন্যা, খরা, ঝড় প্রতি বছর কোনো না কোনো দুর্যোগে লাখ লাখ কৃষক নিঃস্ব হয়ে যান। কৃষি বীমা থাকলে এই ঝুঁকি অনেক কমে।
কৃষক ও ভোক্তা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজনকে হত্যা করা যায় না। কৃষক যদি লাভ না করে, তাহলে এক সময় সে চাষ ছেড়ে দেবে। তখন খাদ্য আমদানি করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং ভোক্তাকেও দ্বিগুণ দাম দিয়ে খেতে হবে। তাই কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো মানে, ভোক্তার পকেটে টাকা রাখা। আর ভোক্তার স্বস্তি মানে, কৃষকের বাজার নিশ্চিত করা। সরকার, বেসরকারি খাত, সমবায়, এনজিও সবাইকে মিলে এই দুপক্ষের স্বার্থের সেতুবন্ধ তৈরি করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের কৃষি টিকে থাকবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি বাস্তব দাবি। কৃষক ও ভোক্তা, দুজনের জন্যই একটি ন্যায্য বাজার গড়ে তুলতে হবে। এটিই এখন, সময়ের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
লেখকঃ ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক
Khosru193@gmail.com