বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ১৯৭১ সালে, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। এ স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। কথা ছিল প্রতিটি নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। এই মুক্তি কেবল বিদেশি শাসক থেকে ছিল না বরং ছিল ব্যক্তির ভেতরের সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা, অসহায়তা এবং ভয়ের থেকে মুক্তি। দার্শনিক জঁ-জাক রুশো বলেছেন, মানুষ তখনই স্বাধীন যখন সে নিজের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা অন্যের অধিকার, জীবন ও মর্যাদার সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি না করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও এই দর্শনকে প্রমাণ করে। শুধু স্বাধীনতা অর্জন নয় স্বাধীনতা রক্ষা করা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থাপন করা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত স্বাধীনতার পরিচয়। আর প্রকৃত স্বাধীনতা আসে তখন যখন ব্যক্তি শিক্ষিত, যোগ্য এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় হয়ে নিজের জীবন পরিচালনা করতে পারে। শুধু নিজেকে নয়, অন্যের জীবনকেও সমৃদ্ধ করে। স্বাধীনতা কখনো স্বার্থপর বা একনায়ক মনোভাবের জন্য ব্যবহার করা যায় না। স্বাধীনতা মানবিকতা, নৈতিকতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্বাধীন দেশে একজন বাবা বা মা তার সন্তানকে স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয় বা কর্মস্থলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন সন্তান ঘরে না ফেরা পর্যন্ত। এই দুশ্চিন্তার মূল কারণ হলো রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস।
আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচারী মানসিকতা ও অভ্যাস এবং দলীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব মানুষের নিরাপত্তার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার সঠিকভাবে রক্ষা পায় না এবং কিছুটা হলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে থাকে, সেখানে মানুষ সত্যিকারের নিরাপদ বোধ করতে পারে না। তারেক রহমানের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, খাদ্য ও জ¦ালানির দাম আকাশছোঁয়া। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন। দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, লুটপাট আর্থিক স্থিতিশীলতা কমিয়ে দিয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তায় অব্যবস্থাপনা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অবস্থা অনিশ্চিত। সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অবকাঠামো দুর্বল। স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও অবকাঠামো, শিক্ষক দক্ষতা ও সুযোগ সীমিত। গ্রামীণ শিশু ও যুবক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট। নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, বৈষম্য বেড়েছে। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, লিঙ্গবৈষম্য, ঘৃণার রাজনীতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করছে। কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, মাদক এবং অপরাধের বিস্তার সবই রাষ্ট্রের দুর্বলতার ফল। আজও রাষ্ট্রের কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র নির্দেশ করছে, পরিবর্তন হয়নি। তবু এর মধ্যেই মানুষ অন্তত একজন রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে শুনেছে তাদের ন্যায্য পাওনা, মর্যাদা, সমান অধিকার, ভোট, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কেউ বঞ্চিত থাকবে না, কেউ নিপীড়িত হবে না, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের এবং জনগণই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’ এই প্রেক্ষাপটে কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দেশপ্রেম, ইতিহাসের শিক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে সমসাময়িক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানকে ভরসার জায়গা হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
যার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমরা যখন ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ নিয়ে ভাবি, তখন এমন একটি দেশের কল্পনা করি, যেখানে প্রতিটি মানুষ নারী, শিশু, যুবক, কৃষক, শ্রমিক নির্ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারে এবং নিরাপদে ফিরে আসতে পারে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, পরিবার নিরাপদ নয়; পরিবার নিরাপদ না হলে সমাজ নিরাপদ নয়; সমাজ নিরাপদ না হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তারেক রহমানের বক্তব্যও এই বিষয়কে স্পষ্ট করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক দিক থেকে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে দরকার সমৃদ্ধি ও সমতার ভিত্তি। কয়েক কোটি কৃষক-শ্রমিক, লাখো তরুণ প্রজন্ম, কোটি কোটি শিশু এবং প্রতিবন্ধী মানুষ এরা প্রত্যেকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ। কার্ল মার্ক্সের মত অনুযায়ী, রাজনৈতিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়, বাস্তব স্বাধীনতা আসে যখন মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়। অর্থাৎ নিরাপদ বাংলাদেশ মানে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও বোঝায়। তারেক রহমানের অসংখ্য বক্তব্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার, বাক-স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ পুনরায় পেতে চায়। একটি নিরাপদ দেশ গড়ার জন্য রাষ্ট্রকে নাগরিকদের মতামত শোনার, অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন প্রদানের দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের শক্তিশালী ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে, নাগরিকরা যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। তারেক রহমান বলেছেন, ‘যে কোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর-শান্ত থাকতে হবে। দেশের শান্তি চাই।’ অপরাধ, সন্ত্রাস ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ রাখতে রাষ্ট্রের নীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসন কার্যকর হতে হবে। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায় প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ বসবাস করে। নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে ধর্মীয় সহমর্মিতা, সামাজিক সংহতি এবং নৈতিক মূল্যবোধকে রাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কেবল ক্ষমতা দখল নয়, মানবিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। যেখানে নেতা জনগণের পাশে থাকবে, তাদের আশা ও আকাক্সক্ষা বুঝবে এবং গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে, সেই দেশেই মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং নাগরিক তিন স্তরের সমন্বয়েই নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। যদি দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে, তাহলে এই স্বপ্ন বাস্তব হবে। তারেক রহমান বারবার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা’। তার রাজনীতি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক। নারী শিক্ষা, শিশু অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও প্রান্তিক জনগণের অন্তর্ভুক্তিই তার কাজের মূল দিক। তার মতে, রাজনীতি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়। এই রাজনৈতিক সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হলো জীবনঘনিষ্ঠ রাজনীতি। তিনি বলেছেন, বিএনপির আগামী দিনের নীতি হবে জনগণের জীবন উন্নয়নের রাজনীতি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী অধিকার ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন এসবকে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রে রেখেছেন। তারেক রহমান বিশ^াস করেন, ‘রাষ্ট্র পুনর্গঠন তখনই সম্ভব, যখন জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়, রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’ তার নেতৃত্বে বিএনপি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পথে হাঁটছে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চল বা মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হবে। ন্যায় ও অংশগ্রহণ যার কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জনগণের ক্ষমতায়নের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান। যিনি অতীতের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের শিক্ষা যেমন ধারণ করছেন, তেমনি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জকেও বাস্তবসম্মতভাবে মোকাবিলার রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাত্তরের আত্মত্যাগ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশাকে একসূত্রে গেঁথে তিনি নতুন প্রজন্মের সামনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার দিগন্ত উন্মোচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণের রাজনৈতিক অঙ্গীকার করেছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে যে রাষ্ট্রচিন্তা তা ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণের ভিত্তি। এই দর্শন গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক। এর শেকড় প্রথিত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে যা ছিল সর্বজনীন, অবৈষম্যভিত্তিক ও মানবিক।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
sk.rafiq1982@gmail.com