চরম নৈরাজ্যের মধ্যেই ফের বাড়ল ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা।
আনুপাতিকহারে অন্যান্য ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার এবং গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যদিও সারা দেশে চাহিদার তুলনায় মাত্র দেড় শতাংশের মতো সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে সরকারি কোম্পানির।
এদিকে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও খুচরা পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বাজার স্বাভাবিক রাখতে মাঠ প্রশাসনকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
আজ রবিবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চলতি মাসের জন্য নতুন দর ঘোষণা করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
ঘোষিত দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ (মূসক/ভ্যাট) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা। গত মাসে তা ছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। অর্থাৎ এ মাসে দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা ৪২ পয়সা। একইহারে বাড়ানো হয়েছে সাড়ে ৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ওজনের এলপিজির দাম। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মাসে তা ছিল ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতিমাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে কখনোই এলপিজি বিক্রি হয়না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। গত এক মাস ধরে এলপিজির সরবরাহ সংকট চলছে। প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।
বাড়তি দামের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ব্যবসায়ীরা বলেছেন, উৎপাদন পর্যায়ে তারা নির্ধারিত দামেই পরিবেশকের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে। উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি দামের অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পণ্যবাহী জাহাজের সমস্যাটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে হচ্ছে। আমি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিদের বলেছি, তারা যেন সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিটা বাড়ায়। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজের ঘাটতি আছে। এ ছাড়া এলসি ইস্যু নিয়েও সমস্যাটা হচ্ছে যে, কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে, কিন্তু পণ্য আনতে পারছে না। এরপরেও যদি কেউ এলসি খোলা নিয়ে জটিলতায় পড়ে, সেক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হওয়া উচিত ১০০০ টাকা। ১২০০ টাকার সিলিন্ডার ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। দায়িত্বহীন ব্যবসা হতে পারে না, ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব নিতে হবে। এলপিজির দাম কমানোটা চ্যালেঞ্জ, এ জন্য ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব নিতে হবে, বেশি মুনাফা করে টাকা পাচারের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
কৃত্তিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ
খুচরা বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে অস্বাভাবিকতার প্রেক্ষাপটে রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম। এতে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব), এলপিজি অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে জানানো হয়, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবু খুচরা পর্যায়ে একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ সংকট এবং কিছু কার্গোর ওপর নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে আমদানি পর্যায়ে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে তা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার যৌক্তিক কারণ নয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এলপিজির আমদানি ছিল ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন, আর ডিসেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধি পেলেও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনও বাস্তব কারণ নেই।
এলপিজি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বৈঠকে জানান, বিইআরসি দাম সমন্বয় করতে পারে-এমন ধারণা থেকে অনেক খুচরা বিক্রেতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, সবুজ জ্বালানিতে উৎসাহ, এলসি সহজীকরণ ও ভ্যাট হ্রাসসহ অ্যাসোসিয়েশনের উত্থাপিত কয়েকটি দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে লোয়াবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন রশিদ বলেন, বৈঠকে সংকটের কারণ সম্পর্কে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সক্ষমতা রয়েছে সরকারের সহযোগিতা পেলে এলপিজি আমদানির জটিলতা কমবে। সপ্তাহ খানের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে এলপিজির বর্তমান বাজারের সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে রবিবার জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সাক্ষাত চেয়ে চিঠি দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সংগঠনটি রাতে সারা দেশের এলপি গ্যাস বিক্রেতার সঙ্গে অনলাইনে একটি বৈঠকও করেছে।
এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে কমিশন।
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকটের কারণে গৃহস্থালি রান্নার পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ছোট-বড় শিল্পকারখানায়ও এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে।