আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রধারী দেহরক্ষী বা গানম্যান চেয়ে পুলিশ কর্র্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। পাশাপাশি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন কয়েকজন রাজনীতিবিদ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মুখপাত্র সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে কয়জন প্রার্থী গানম্যান চেয়েছেন তা জানাননি তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা ও গানম্যান চেয়ে চট্টগ্রামের কয়েকজন রাজনীতিবিদ বা এমপি পদপ্রার্থীর আবেদন তাদের কাছে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা এবং এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে হামলায় সরোয়ার হোসেন বাবলা নামে একজন নিহত হওয়ার পর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান বা পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন একাধিক প্রার্থী।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন তার দপ্তরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে চট্টগ্রাম নগর ও উপজেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে ৪২ জন ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে রয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রার্থীদের নিরাপত্তাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। গানম্যানের জন্য কোনো প্রার্থী আমাদের কাছে এখনো আবেদন করেননি। করে থাকলে হয়তো পুলিশ কর্র্তৃপক্ষের কাছে করেছেন। তবে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর আমরা আরও কঠোর হব। প্রার্থীরা চাইলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গানম্যানসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে আমরা প্রস্তুত।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে গত ১৫ ডিসেম্বর ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা-২০২৫’ জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও সশস্ত্র রক্ষী নিয়োগে এ নীতিমালা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে গত বছরের নভেম্বরে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে আমি নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো কিছু জানায়নি।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা এবং ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ওইদিন একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর এমন ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ সুস্থ হয়ে আবার নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন।
সিএমপির মুখপাত্র সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘প্রার্থী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে বা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে তাদের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত পুলিশ প্রশাসন।’ তবে চট্টগ্রামে এবার বড় নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে গণঅভ্যুত্থানের পর থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে পুলিশ কিছু উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও বেশিরভাগ অস্ত্র রয়ে গেছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দাগি আসামি, জেল পলাতক ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতায় অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে হবে। এটি সরকার একা করতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়ে করতে হবে।’
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের বিএনপি মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থী এনামুল হক এনাম বলেন, ‘ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বড় ধরনের ষড়যন্ত্র দেখছি। পলাতক ফ্যাসিস্টরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে আমার ধারণা।’