হাজার কোটির ফসল চাষের ব্যস্ততা

দীর্ঘ ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকা হাওরে এখন ফসল চাষের ব্যস্ততা। এই ফসল হাওর পাড়ের প্রধান খোরাক। যার ওপর নির্ভর করে কাটে স্থানীয় কৃষকদের সারা বছর। জমিতে মাড়াই কিংবা চারা রোপণ এমন দৃশ্য এখন দেখা মেলে নেত্রকোনার হাওরগুলোতে।

উচিতপুর হাওরের কৃষক ফজলুল হক। হাওরের ১৬ কাঠা জমিতে রোপণ করেছেন হাইব্রিড জাতীয় ধানের। চাষাবাদে বাড়তি খরচ আর ব্যয়ের বোঝা কমাতে নিজেই চাষ করছেন। গেল কয়েক বছর ভালো ফলন ঘরে ওঠায় এবারও সেই স্বপ্ন নিয়েই তার দিন-রাতের ব্যস্ততা।

ফজলুল হকের মতো হাওর পাড়ের লাখো কৃষকের হাওরের এই বোরো ফসলেই ভরসা। জমিগুলো থেকে পানি নামায় বোরো ধান রোপণে মহাব্যস্ত হাওরের

কৃষকরা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই চাষাবাদ চলবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। সার কীটনাশক আর আনুষঙ্গিক চাষাবাদের পর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এই ফসল ঘরে তুলবেন তারা।

তবে বছর বছর চাষাবাদের খরচ বাড়ায় ব্যয়ের বোঝা কাঁধে পড়েছে হাওরের কৃষকদের। তারা জানান, চলতি বছর জ্বাালানির তেল থেকে শুরু করে বীজ সার কীটনাশক সবকিছুতেই বাড়তি খরচ হচ্ছে তাদের। সঙ্গে আকস্মিক দুর্যোগে ফসল হানির আতঙ্ক। যদিও গেল কয়েক বছর হাওরে ভালো ফলন হয়েছে, তাই এবারও দুর্যোগের শঙ্কা কাটিয়ে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু করেছেন তারা।

চলতি বছর হাওরে বিধান ৮৮, ৮৯, ৯২ জাতের ধানের চাষ হচ্ছে। তবে স্বল্প সময়ে অধিক ফলন হওয়ায় হাওরের কৃষকদের হাইব্রিড জাতীয় ধান চাষেই আগ্রহ বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরে শুধু হাওর বিস্তৃত ৬ উপজেলায় প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ থেকে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় তিন লাখ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২৭ কোটি টাকা।

এ ছাড়া চলতি বছর পুরো জেলায় প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ থেকে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা।

উচিতপুর হাওরের কৃষক ফজলুল হক বলেন, ‘এ বছর এখন পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৬ কাঠা জমিতে বোরো ধানের চারা লাগানো হয়েছে। তবে চাষাবাদে খরচ অনেক বেশি। খরচ বেশি হওয়ায় আমরা এখন নিজেরাই চারা রোপণ করছি। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। গত বছর ফলন অনেক ভালো হয়েছিল, আশা করছি, ফলন ভালোই হবে। এখন ধান রোপণের উপযুক্ত সময়, তাই সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ পর্যন্ত ১৬ কাঠার মতো জমিতে ‘২৯ ধান লাগাইছি। আরও কিছু জমি আছে, সেগুলোতে হাইব্রিড ধান লাগাব। এখন সবাই পানি আটকে যে যার মতো জমি চাষ করছেন। কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউ বা জমি প্রস্তুত (মই দেওয়া) করছেন। হাওরের কৃষকরা এখন বছরের একমাত্র ফসল চাষে মহাব্যস্ত।’

বোয়ালী হাওরের কৃষক মোহাম্মদ বাইজিদ বলেন, ‘হাওরের ফসল যদি ভালো হয়, তবে পরিবারের সবাই ভালো থাকতে পারে। আর ফলন খারাপ হলে পরিবার নিয়ে অনেক বিপদে পড়তে হয়। ঋণগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুটতে হয়। তাই এবারো আশা নিয়ে সবাই হাওরের মাঠে নেমেছি। এখন মূলত সবাই ধানের চারা (জালা) লাগাচ্ছে। কিছুদিন পর সার দেওয়া হবে। এরপর নিড়ানি বা আগাছা পরিষ্কার করা হবে। সব ঠিক থাকলে বৈশাখের শুরুতেই নতুন ফসল ঘরে উঠবে। তবে চাষাবাদের খরচ দিন দিন বাড়ছে। সার, কীটনাশক, বীজ ও শ্রমিকের মজুরিসহ সবকিছুর দামই এখন চড়া। প্রতি বছরই খরচ বাড়ছে, তবে ফলন ভালো হলে এই কষ্ট তেমন একটা গায়ে লাগে না।’

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার কৃষিবিদ ড. চন্দন কুমার মহাপাত্র বলেন, ‘এ বছর আমাদের বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে। ইতিমধ্যেই হাওর অঞ্চলে রোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বেশিরভাগ জমিতেই চারা লাগানো শেষ। হাওর অঞ্চলে মূলত ব্রি-ধান ৮৮, ৮৯ ও ৯২-এর পাশাপাশি হাইব্রিড জাতের ধানের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা কৃষকদের বীজতলা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা মাঠপর্যায়ে দিয়ে আসছি। আদর্শ বীজতলা তৈরি এবং রোগ-বালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধে আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর হাওরে ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যেহেতু হাওরে আগাম পাহাড়ি ঢল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে। তাই ফসল রক্ষা বাঁধগুলো যেন সময়মতো নির্মাণ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকরা যেন দ্রুত বা আগাম ফসল ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য কম্বাইন হারভেস্টারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি আমরা সরবরাহ করছি।’