রাজনীতিকদের হাতে জিম্মি ক্রিকেট, জয় শাহ কখনো ব্যাটই ধরেননি: আশরাফুল

মোস্তাফিজুর রহমান ইস্যুকে কেন্দ্র করে আইসিসি, বিসিসিআই'র সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং এশিয়ার ক্রিকেট প্রশাসনে রাজনীতিকীকরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন সৈয়দ আশরাফুল হক। এই বিরোধের ফলে বাংলাদেশ নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারতের বাইরে বিশ্বকাপ ম্যাচ সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে। 

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সাবেক সিইও সৈয়দ আশরাফুল হক মোস্তাফিজুর রহমান এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান বিতর্ককে তিনি "হাস্যকর" এবং "একটি প্যারোডি" বলে অভিহিত করেছেন।
কুয়ালালামপুরে অবস্থাররত সৈয়দ আশরাফুল হক ভারতের একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, উপমহাদেশের ক্রিকেট এখন এমন সব রাজনীতিবিদদের দ্বারা "হাইজ্যাক" হয়েছে যারা ক্রিকেট বোঝেন না এবং এর বৃহত্তর প্রভাব সম্পর্কেও তাদের ধারণা নেই।

"ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান—সব জায়গার পুরো ক্রিকেট ব্যবস্থা এখন রাজনীতিবিদরা হাইজ্যাক করে নিয়েছে। একবার ভেবে দেখুন, জগমোহন ডালমিয়া, আইএস বিন্দ্রা, মাধবরাও সিন্ধিয়া, এনকেপি সালভে বা এমনকি এন শ্রীনিবাসনের মতো মানুষরা যদি দায়িত্বে থাকতেন, তবে কি এমনটা হতো? এটি কখনোই হতো না কারণ তারা পরিপক্ক মানুষ ছিলেন। তারা খেলাটা বুঝতেন এবং এর প্রভাবগুলো বুঝতেন।"

তিনি আরও যোগ করেন, "এখন এটি পুরোপুরি হাইজ্যাক হয়ে গেছে। আপনাদের (ভারত) এমন লোক আছে যারা কোনোদিন ব্যাট ধরেনি। আপনাদের ক্ষেত্রে জয় শাহ আছেন, যিনি এমনকি কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে কোনোদিন ক্রিকেট ব্যাটও ধরেননি।"

আশরাফুল হক বলেন, ''মোস্তাফিজের বদলে যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতো, তবে কি তারা একই কাজ করত? তারা করত না।" এই বিতর্ককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে হক বলেন, "এটি পুরোটাই সস্তা ধর্মীয় অনুভূতি যা নিয়ে রাজনীতিবিদরা খেলছেন।" তিনি যুক্তি দেখান অতীতেও এ ধরনের সমস্যা হয়েছে এবং এর সমাধানও হয়েছে, "এটি একটি বিশ্ব আসর। আপনি চান বিশ্বের সব দেশ খেলুক। এটি অতীতেও হয়েছে। আগে পয়েন্ট ছেড়ে দেওয়া হতো (ওয়াকওভার)। এখানে জটিল বিষয় হলো বাংলাদেশ সব ম্যাচ ভারতে খেলছে। যদি তারা অর্ধেক ম্যাচ শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোথাও খেলত, তবে সেটিই যথেষ্ট হতো। আমরা দুটি ম্যাচে ওয়াকওভার দিয়ে বাকিগুলো খেলতে পারতাম, যেমনটা ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিল। অনেক দলই সেটা করেছে। কিন্তু এখন নিরাপত্তা জনিত কারণে পুরো হাইব্রিড মডেলের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।"

বর্তমান পরিস্থিতিকে 'প্রহসন' হিসেবে বর্ণনা করে সৈয়দ আশরাফুল হক বলেন, "যদি ভারত হুমকি দেয় যে মোস্তাফিজ দলে থাকলে তবেই সে ওখানে থাকবে, কিন্তু আমাদের দলের অধিনায়কত্ব করছে লিটন দাস। এটা কি একটা প্যারোডি নয়?"

এই অচলাবস্থার জন্য নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনীতিকে দায়ী করে এই অভিজ্ঞ প্রশাসক বলেন, "অপরিণত রাজনীতিবিদরা যখন দায়িত্ব নেয় তখন এমনই হয়। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে আপনাদের নির্বাচন আছে, তাই ভোট পাওয়ার জন্য আপনারা এই রাজনৈতিক কার্ড খেলছেন। আর এতে আপনারা বিশ্বকাপের মতো একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্টকে সংকটে ফেলছেন।"

আশরাফুল হক মনে করেন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে, 'যদি তারা (আইসিসি) এটি শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করতে পারে, তবে তাসবার জন্যই ভালো হবে। যদি তারা তা না পারে, তবে বাংলাদেশ খেলতে ভারতে যাবে কি না সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে।" বিসিবির দাবি আইসিসি না মানলে এবং বাংলাদেশ সরকার দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানালে আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "হয়তো এতে আমাদের আর্থিক ক্ষতি হবে। কিন্তু জাতীয় মর্যাদা আর্থিক ক্ষতির চেয়ে অনেক বড়।"

অতীতের সংকটের সাথে তুলনা করে হক ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরবর্তী সময়ের কথা স্মরণ করেন, যখন তিনি এসিসির দায়িত্বে ছিলেন। "আপনি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সাথে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের তুলনা করতে পারেন না। এটি একেবারেই আলাদা। ভারত ও বাংলাদেশ ভাইয়ের মতো। এটি অনেক পুরনো সম্পর্ক। ভারত বাংলাদেশে টেস্ট ম্যাচ খেলতে এসেছিল। আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে বিসিসিআই বড় ভূমিকা রেখেছিল।"

সবশেষে আশরাফুল যোগ করেন, "২০০৮ সালের পরিস্থিতি এর চেয়ে অনেক বেশি নাজুক ছিল এবং আমরা তা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমরা পেরেছিলাম কারণ তিনটি সংস্থাতেই (বিসিসিআই, পিসিবি, বিসিবি) আমাদের ভালো এবং সুস্থ মস্তিস্কের প্রশাসক ছিল। এখন আমাদের তা নেই।''