পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হতে চায় তুরস্ক

সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে তুরস্ক। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পেলে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, একটি নতুন সামরিক জোটের সূচনা হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যে বেশ অগ্রসর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আংকারা ও রিয়াদের সঙ্গে ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।

এদিকে পাকিস্তান আফ্রিকার দেশ সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বড় অঙ্কের অস্ত্র সরবরাহ চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সুদানের সরকারি বাহিনী বর্তমানে সৌদি আরব ও তুরস্কের সমর্থনপুষ্ট এবং তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত।

এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সুদানকে কারাকোরাম-৮ মডেলের যুদ্ধবিমান, বিপুল সংখ্যক নজরদারি ও আক্রমণ সক্ষম ড্রোন এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করতে পারে। পাকিস্তানের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এতে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে যদি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা তিনটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশের কৌশলগত সক্ষমতাকে একত্র করবে। সৌদি আরব আরব বিশ্বের একমাত্র জি-২০ সদস্য রাষ্ট্র ও দুই পবিত্র নগরীর অধিকারী দেশ, পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী।

এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থান করা তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অস্ত্র উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে সিরিয়া ও লিবিয়ায় দেশটির সক্রিয় সামরিক উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। একই পথে হাঁটছে পাকিস্তানও, যা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা শিল্পকে আয়ের উৎসে পরিণত করতে চাইছে।

গত বছরের শেষ দিকে পাকিস্তান লিবিয়ার এক সামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কয়েকশ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করে। পাশাপাশি সৌদি আরবের দেওয়া ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তরের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এই যুদ্ধবিমানগুলো চীন ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্ক—দুই দেশেরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও আংকারা ও রিয়াদের মধ্যে অতীতে মতানৈক্য ছিল। আরব বসন্তের সময় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক বাস্তবতা বদলেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

গাজা যুদ্ধ, সিরিয়া পরিস্থিতি এবং লেবানন ও ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নতুন করে কাছাকাছি এনেছে। সিরিয়ার বর্তমান সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে দুই দেশের নেতৃত্ব একই অবস্থান নিয়েছে।

সুদানের গৃহযুদ্ধ ও ইয়েমেন পরিস্থিতিতেও আঞ্চলিক মিত্রতার সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। সৌদি আরব ও ইউএইয়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোট মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।