এক উজ্জ্বল বাতিঘর

সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি। তার জন্মদিন চলে গেল গতকাল। ১ দিন পর হলেও তার স্মৃতি ও আত্মার প্রতি জানাই অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। প্রগাঢ় মানবতাবোধ সম্পন্ন একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি। অসুন্দর-অকল্যাণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে আমৃত্যু ছিল তার অবস্থান। এ জন্যই তার নাম বিচারালয়ের চার দেয়ালের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধোত্তর (১৯৪৩) ব্রিটিশ ভারতে ‘আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম’ সংস্থার মাধ্যমে মানবতার সেবায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দেশ ভাগের আগে ও পরে সংঘটিত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। অবিভক্ত বাংলায় ১৮৯০ সালে সৈয়দ আমীর আলী, কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম মুসলমান বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের পূর্বপুরুষ। এরপর তার পুত্র সৈয়দ তারিক আমীর আলীসহ অনেক বাঙালি মুসলমান হাইকোর্টের বিচারপতি হন। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ১৯৬২-৬৩ সালে পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্টের বিচারক এবং ১৯৬৪ সালে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে ছিলেন বিচারপতি মোরশেদ। তার মায়ের নাম আফজালুন্নেছা। পিতা সৈয়দ আবদুস সালেক ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে যোগ দেন  বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে তিনি বগুড়া, দিনাজপুর জেলায় নিযুক্ত ছিলেন। একজন সৎ, ধর্মপ্রাণ ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে খ্যাতি আর্জন করেছিলেন তিনি। তার সন্তান ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ।

১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বগুড়া স্কুল থেকে সর্বোচ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯৩১ সালে অর্থ নীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং প্রথম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি নেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিতর্ক দলের নেতৃত্ব  দিয়েছেন, কলেজ জীবনে ক্রীড়া ক্ষেত্রেও তিনি সুনাম অর্জন করেন। ত্রিশের দশকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সংগঠনের দায়িত্বও পালন করেন। সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৩৪ সালে। এক্ষেত্রে তিনি মামা এ কে ফজলুল হকের সহকারী না হয়ে, সুভাষ চন্দ্রের অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু এবং খ্যাতনামা আইনজীবী কে বি খাইতানের জুনিয়র হয়ে কাজ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন। কিছুদিন পর আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্য যান। ১৯৩৮ সালে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে বার এট ল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন । ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বারে প্র্যাকটিস করেন। ১৯৫৫ সালে যখন মোহাম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী, তখন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তখন বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলা ছিল তৎকালীন প্রভাবশালী সরকারের বিরুদ্ধে। মরহুম বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরীর মতে : বিচারপতি মোরশেদের রায় ছিল ইতিহাসের মাইলফলক, দেশের সাংবিধানিক আইনের ম্যাগনাকার্টা স্বরূপ। প্রখ্যাত আইনবিদ বীরেন সরকার মন্তব্য করেন : ‘তিনিই একমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবি আদায়ের ব্যাপারে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ।’ দেশে তখন হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট সরকার। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এ সময় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকও কিছুদিন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন। তবে তিনি ছিলেন আইনের শাসনের অবিচল প্রবক্তা। ১৯৫৮-এর অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়। মানুষের সব মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়। তখন দেশের উচ্চ আদালতের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতরও বটে। তখন বিচারপতির আসনে থেকে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। এর মধ্যে অনেক মামলা ছিল তৎকালীন প্রতাপশালী সরকারের বিরুদ্ধে।

নির্ভেজাল গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি ছিলেন একজন অবিচল দৃঢ়চেতা নির্ভীক ব্যক্তিত্ব। কর্মক্ষেত্রে যেমন ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ, তেমনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তার কর্মক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত এবং প্রসারিত। বাংলা-ইংরেজি ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভাষায় তার দখল ছিল। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। দেশভাগের সময় কায়েদি আজম মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে সমালোচনা করার ফলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি  হয়েছিল। এ ছাড়া প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে একটি লেখা সেময় সারা আরব বিশ্বে বেশ ঝড় তুলেছিল। ‘গণতন্ত্রই মানুষের সর্বোচ্চ অধিকার’ এই কথা মনে রেখে তিনি তার ঐতিহাসিক বিচার বিভাগীয় রায় দিতেন। এই অসামান্য গুণসম্পন্ন মানুষ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু রেখে গেছেন অনুকরণীয় অসংখ্য দৃষ্টান্ত, যা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিনিয়ত সহায়ক হবে।

অনন্তকাল তিনি বেঁচে থাকুন পরম শ্রদ্ধায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে,  হৃদয় থেকে হৃদয়ে।

লেখক : মহাসচিব, মোরশেদ স্মৃতি সংসদ।