কারা পণ্যেই আগ্রহ বেশি

৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার (ডিআইটিএফ-২০২৬) প্রবেশপথের পূর্বপাশে চোখে পড়ে একটি মিনি জেলখানার দৃশ্য। দুই পাশে ১৪টি সেলের দরজা, মাঝে কেন্দ্রীয় কারাগারের আদলে তৈরি প্রধান ফটক বাইরে থেকে দেখে মনে হয় বাস্তব কারাগার। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় সব ধারণা। এখানে সাজানো হয়েছে কারাবন্দিদের নিপুণ হাতে তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প ও পণ্যের প্রদর্শনী। প্যাভিলিয়নের প্রধান ফটকে লেখা রয়েছে ‘কারা পণ্য বাংলাদেশ জেল’। এই প্যাভিলিয়নের মূল উদ্দেশ্য কারাগারে থাকা বন্দিদের হাতকে শ্রমের হাতে রূপান্তর করা, তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে ফিরে আসার পথ সুগম করা।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা মানেই ভিন্নমাত্রার আয়োজন। পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে এক মাস ধরে চলে এ উৎসবমুখর পরিবেশ। দেশি-বিদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয় এখানে। এবারের ৩০তম আসরেও মেলা প্রাঙ্গণ দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত।

গত কয়েক বছর ধরে কারা অধিদপ্তরের উদ্যোগে কারাবন্দিদের তৈরি পণ্যের স্টল থাকছে মেলায়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

মেলার নবম দিনে এ স্টলে দেখা গেছে ব্যাপক ভিড়। বাংলাদেশে ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৮৪ হাজার বন্দি রয়েছেন। তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নানা হস্তশিল্পে। প্রশিক্ষণ শেষে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। অবসর সময়ে তারা তৈরি করেন নানা পণ্য। ২০১৮ সাল থেকে কারা পণ্য নিয়ে বাণিজ্য মেলায় অংশ নিচ্ছে কারা কর্র্তৃপক্ষ। এবার গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ ও ২, মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, যশোর, ফরিদপুর, খুলনাসহ ২৭টি কারাগারের বন্দিদের তৈরি পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বাঁশ ও বেতের মোড়া, প্লাস্টিকের কুলা, কাঠের বুক শেলফ, খুন্তি, শোপিস, একতারা, পাটজাত ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, নকশিকাঁথা, টিস্যু বক্সসহ ৩০০টিরও বেশি পণ্য রয়েছে এখানে। পুঁতি দিয়ে তৈরি সৌন্দর্যবর্ধক সামগ্রীও আকর্ষণ করছে দর্শনার্থীদের। বিশেষ করে নকশিকাঁথা ও জামদানি শাড়ির প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি। অনেকে পছন্দমতো পণ্য কিনে নিচ্ছেন। কারা কর্র্তৃপক্ষের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এ উদ্যোগ। জেল থেকে বেরিয়ে বন্দিরা যাতে আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন, সেই লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্টলে ঘুরতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘কারা পণ্য’ লেখা দেখে কৌতূহলী হয়ে ঢুকেছেন তারা। পণ্যের কারুকাজ ও গুণগত মান দেখে অবাক হয়েছেন। অনেকে বলেন, জেলে থেকেও এমন নিখুঁত কাজ সম্ভব এটা চিন্তার বাইরে।

যাত্রাবাড়ী থেকে আসা আকাশ মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছরই মেলায় এসে কারা পণ্যের স্টল খুঁজে বের করি। এখানকার গামছা ও ঝাড়ু খুব ভালো। দামও কম। এক বছরের জন্য কিনে নিয়ে যাই।’

উত্তরা থেকে আসা সুমনা আকতার বলেন, ‘পণ্যের গুণগত মান খুব ভালো। দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। প্রয়োজনীয় কয়েকটি জিনিস কিনলাম।’

প্যাভিলিয়নের ইনচার্জ ও কারাগারের ডেপুটি জেলার ইয়াসমিন জাহান জুঁই বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু বিক্রি নয়। কারাবন্দিরা যদি জেলে থেকে এত সুন্দর ও নিখুঁত পণ্য তৈরি করতে পারেন, তাহলে বাইরের মানুষরা তো আরও ভালো কিছু করতে পারবেন। এটি তাদের সংশোধন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রচেষ্টা।’

তিনি জানান, ৩৮টি ট্রেডে ৬৯ হাজার বন্দিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৮ হাজার বন্দি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। প্রতিবারের মতো এবারও বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ শতাংশ কারাবন্দিদের দেওয়া হবে, বাকি ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হবে। বন্দিরা এ অর্থ খরচ করতে পারেন বা পরিবারের কাছে পাঠাতে পারেন।