জানুয়ারির হিমেল হাওয়ায় যখন পৌষের বিদায়ঘণ্টা বাজে, তখনই ঢাকার আকাশ হয়ে ওঠে এক বিশাল ক্যানভাস। সাকরাইন মানেই লাটাইয়ের টানে হাজারো রঙিন ঘুড়ির স্বাধীনতা। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
পৌষের বিদায় আর মাঘের আগমনে বাংলার আকাশ যখন কুয়াশার চাদর সরিয়ে রোদের ঝিলিক দেয়, তখনই শুরু হয় এক পশলা রঙের খেলা। এই রঙের নাম সাকরাইন। কেউ একে মকর সংক্রান্তি বলেন, কেউ বা বলেন পৌষ সংক্রান্তি। নাম যা-ই হোক, এর মূল সুরটি মিশে আছে মাটির গন্ধে, ফসলের ঘ্রাণে আর নাগরিক আকাশের বিশালতায়। এটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের আবেগ, শৈশব আর ঐতিহ্যের এক বিশাল কোলাজ। হাজার বছরের পুরনো এই উৎসবটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলেছে, কিন্তু এর প্রাণভোমরা রয়ে গেছে সেই আগের মতোই সতেজ।
সাকরাইনের আদি কথা
মকর সংক্রান্তি মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। সূর্য যখন মকর রাশিতে প্রবেশ করে এবং দক্ষিণায়ন শেষ করে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করে, যাকে আমরা উত্তরায়ণ বলি, তখনই এই উৎসবের লগ্ন আসে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে এই দিনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন গোলায় নতুন ধান উঠত, শীতের তীব্রতা একটু কমতে শুরু করত, তখন মানুষ প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে বরণ করে নিত আনন্দের সঙ্গে। সাকরাইন শব্দটি মূলত ‘সংক্রান্তি’ শব্দটিরই অপভ্রংশ। সময়ের পরিক্রমায় গ্রামীণ এই উৎসবটি যখন ঢাকার বুকে আস্তানা গেড়েছিল, তখন তা হয়ে উঠল এক অনন্য শহুরে সংস্কৃতি। পুরান ঢাকার গলিগুলোতে এই দিনটি অন্য যেকোনো উৎসবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এটি যেন ঢাকার নিজস্ব ডিএনএ, যা বংশপরম্পরায় বয়ে চলেছে এই শহরের মানুষ।
পুরান ঢাকার ছাদ
সাকরাইন মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর আকাশছোঁয়া ছাদ। এই উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বাড়ির ছাদ। বছরের এই একটি দিন ঢাকার আকাশ যেন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসে। সকালের মিঠে রোদ গায়ে মেখে যখন হাজার হাজার ঘুড়ি আকাশে ডানা মেলে, তখন মনে হয় যেন নীল আকাশটা একটা বিশাল ক্যানভাস। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি হরেক রঙের ঘুড়িতে ছেয়ে যায় চারপাশ। পেটকাটি, চন্দনা, ভোঁদার মতো বাহারি সব নামের ঘুড়ি যখন আকাশে ওড়ে, তখন শুরু হয় এক অলিখিত যুদ্ধ। সুতায় মাঞ্জা দেওয়া, একে অপরের ঘুড়ি কাটার চেষ্টা আর চারদিক থেকে আসা ‘ভোঁ কাটট্টা’ চিৎকারে পুরো শহর যেন জেগে ওঠে। এই সুতা কাটার লড়াইয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর বন্ধুত্ব আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনন্দ। শুধু ছোটরা নয়, অশীতিপর বৃদ্ধও এদিন লাটাই হাতে নিয়ে তার হারানো শৈশব ফিরে পান। ছাদের ওপর থেকে ভেসে আসা উচ্চৈঃস্বরের গান আর তার সঙ্গে ঘুড়ির নাচন সব মিলিয়ে এক উন্মাদনার নামই হলো সাকরাইন।
আলোর ঝরনাধারা
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই সাকরাইনের রূপ পাল্টে যেতে থাকে। যখন সূর্য পাটে নামে, তখন ঘুড়ির জায়গা দখল করে নেয় আতশবাজি আর ফানুস। একসময় মকর সংক্রান্তি ছিল শান্ত আর স্নিগ্ধ, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক জৌলুস। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে আগুনের ফুলকিতে। নানা রঙের আতশবাজির রোশনাই দেখে মনে হয় যেন আকাশ থেকে তারাগুলো ঝরে পড়ছে ছাদের কার্নিশে। এর পাশাপাশি চলে আগুনের খেলা বা ফায়ার ব্রেদিং। তরুণরা মুখে কেরোসিন নিয়ে মশাল জ¦ালিয়ে আগুনের হলকা তৈরি করে, যা এই উৎসবের রোমাঞ্চ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রঙিন ফানুসগুলো যখন ধীরে ধীরে আকাশের গভীরে হারিয়ে যায়, তখন প্রতিটি ফানুসের সঙ্গে মানুষের মনের একেকটি সুপ্ত বাসনাও যেন ডানা মেলে। এই আলোকসজ্জা কেবল উৎসবের অংশ নয়, এটি যেন আঁধারকে জয় করে আলোর দিকে যাওয়ার এক প্রতীকী যাত্রা।
বাংলার পল্লী প্রকৃতি ঐতিহ্যের স্বাদ
শহরের কোলাহলের বাইরে বাংলার দিগন্তজোড়া মাঠে মকর সংক্রান্তির চেহারাটা কিছুটা ভিন্ন, অনেক বেশি শান্ত ও লোকজ। গ্রামে এটি মূলত নবান্ন ও পৌষের ফসল কাটার উৎসব। খেতের নতুন ধানের গন্ধে যখন বাতাস ভারী হয়, তখন প্রতিটি ঘরে ঘরে শুরু হয় পিঠা বানানোর তোড়জোড়। ভাপা, পুলি, পাটিসাপটা আর চিতই পিঠার সুবাসে ম ম করে আঙিনা। ঢেঁকিতে চাল কোটার সেই পরিচিত শব্দ এখন খুব একটা শোনা না গেলেও, উৎসবের আমেজে কোনো কমতি থাকে না। গ্রামের মেলাগুলোতে বসে মাটির পুতুল, নাগরদোলা আর খই-মুড়কির পসরা। সংক্রান্তির ভোরে কনকনে ঠা-ার মধ্যে নদীতে স্নান করাকে ধরা হয় পুণ্যের কাজ। অনেক জায়গায় গরু-মহিষের দৌড় প্রতিযোগিতা বা মেঠো গান উৎসবের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শহরের সাকরাইন যেখানে যান্ত্রিক জৌলুসে ভরপুর, গ্রামের সংক্রান্তি সেখানে মাটির টানে আর শেকড়ের ঘ্রাণে অনন্য।
যেকোনো বাঙালি উৎসব মানেই ভূরিভোজ, আর মকর সংক্রান্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তিলের নাড়– আর নলেন গুড়ের পায়েস। কথিত আছে, শীতের এ সময়ে মিষ্টিমুখ করা সৌভাগ্যের প্রতীক। পুরান ঢাকার ঘরে ঘরে এদিন নানা পদের খাবারের আয়োজন করা হয়। বাখরখানি থেকে শুরু করে তেহারি কোনো কিছুরই খামতি থাকে না। তবে বিশেষ আকর্ষণ থাকে সাকরাইনের বিশেষ ভোজ। সারা দিন ঘুড়ি ওড়ানো আর লাফালাফি করার পর রাতে যখন সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসে, তখন সেই খাবারের স্বাদ যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার এই সংস্কৃতিই আসলে এই উৎসবের মূল ভিত্তি। শুধু নিজের জন্য নয়, উৎসবের আনন্দটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাঝেই সার্থকতা খুঁজে পায় বাংলার মানুষ। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে ছোট ছোট জিনিসের মাঝে বড় ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়।
আধুনিকতার ছোঁয়া
কালক্রমে সাকরাইন বা মকর সংক্রান্তির ধরনে অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। আগের দিনে ঘুড়ি ওড়ানোই ছিল প্রধান, সেখানে এখন ডিজে গান আর বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার দাপট বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত শব্দ আর ধোঁয়া পরিবেশ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা নিয়ে সচেতন মহলে বিতর্কও আছে। ঘুড়ির সুতায় কাঁচের মাঞ্জা দেওয়ার কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ বা পাখি আহত হয়। আগেকার দিনের সেই ঘরোয়া আমেজ এখন অনেকটাই করপোরেট উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবুও পরিবর্তনের এই স্রোতেও মানুষ তার শেকড়কে ভুলতে পারেনি। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও পুরান ঢাকার মানুষ তাদের পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে বুক দিয়ে। হয়তো লাটাইটা এখন আধুনিক হয়েছে, কিন্তু আকাশের সেই টানটা বদলায়নি। পরিবর্তনের এই ধারায় উৎসবের বাহ্যিক রূপ পাল্টালেও এর অন্তর্নিহিত আনন্দটুকু এখনো অমলিন। সাকরাইন কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বা গোষ্ঠীর উৎসব নয়। এটি বাংলার এক অসাম্প্রদায়িক লোকজ উৎসবের প্রতীক। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যখন ধর্মীয় আচার আর স্নানের মাধ্যমে সংক্রান্তি পালন করেন, তখন মুসলিমপ্রধান পুরান ঢাকার মানুষ মেতে ওঠে ঘুড়ি আর উৎসবে। এখানে ধর্ম কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আকাশটা এখানে সবার জন্য উন্মুক্ত। একজনের ঘুড়ি আরেকজন কাটছে, আবার দিন শেষে সেই মানুষগুলোই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছে এই যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, এটাই সাকরাইনের আসল শিক্ষা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা একই মাটির সন্তান এবং আমাদের উৎসবগুলো আমাদের আলাদা করার জন্য নয়, বরং এক সুতায় বাঁধার জন্য। উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে একই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার নামই হলো প্রকৃত উৎসব।
সোনালি দিনগুলো
অনেকের কাছে সাকরাইন মানেই স্মৃতির অ্যালবাম। শৈশবের সেই ছেঁড়া ঘুড়ি ধরার দৌড়, লাটাইয়ের মাঞ্জা দিতে গিয়ে আঙুল কেটে যাওয়া কিংবা প্রতিবেশীর ছাদ থেকে ঘুড়ি চুরি করার সেই দুষ্টুমিগুলো আজও অনেকের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের আনন্দটা হয়তো যান্ত্রিক হয়ে গেছে, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো এখনো রোমন্থন করলে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। যারা প্রবাসে থাকেন, এই দিনে তাদের মনটাও পড়ে থাকে সেই চেনা ঢাকার ছাদে। আকাশে যখন রঙিন ঘুড়িগুলো দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন আমাদের শৈশবটাই সুতা ছিঁড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে। এই স্মৃতিগুলোই সাকরাইনকে বাঁচিয়ে রাখে বছরের পর বছর। এটি কেবল একদিনের আনন্দ নয়, বরং সারা বছরের অপেক্ষার শেষ প্রহর।
সাকরাইন আমাদের জীবনের এক গভীর দর্শনের কথা বলে। আকাশের ঘুড়ি যেমন সুতার টানে নিয়ন্ত্রিত হয়, আমাদের জীবনটাও হয়তো তেমন কোনো অদেখা টানে বাঁধা। ঘুড়ি যখন কাটা পড়ে, তখন আমরা যেমন হতাশ হই না বরং নতুন করে অন্য একটি ঘুড়ি ওড়াই, জীবনটাও তেমন। প্রতিটি শেষই আসলে একটি নতুন শুরুর সংকেত। সংক্রান্তি মানেই হলো এক ঋতুর সমাপ্তি আর অন্য এক ঋতুর সূচনা। এটি আমাদের শেখায় পুরনো দুঃখ আর গ্লানি ভুলে গিয়ে নতুনভাবে পথ চলতে। আকাশে ডানা মেলা হাজারো ঘুড়ি আসলে মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার প্রতীক। আমরা সবাই চাই সীমানা ছাড়িয়ে আকাশের ওই নীলিমায় হারিয়ে যেতে। আগামী প্রজন্মও যেন এই ঐতিহ্যের মশাল বহন করে নিয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশ বজায় রেখে উৎসবের আসল চেতনাকে ধারণ করতে পারে, সেটাই হোক আমাদের আজকের প্রত্যাশা।
দিনের শেষে যখন রাতের আকাশ শান্ত হতে শুরু করে, আতশবাজির শব্দ কমে আসে এবং শেষ ফানুসটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়, তখন রেখে যায় একরাশ মুগ্ধতা। সাকরাইন কেবল ঘুড়ি ওড়ানোর দিন নয়, এটি বাঙালির বেঁচে থাকার রসদ জোগানো এক মহামিলন মেলা। শীতের হাওয়ায় পিঠার সুবাস আর আকাশের গায়ে রঙের কারুকাজ মিলেমিশে তৈরি হয় এক অনন্য জাদুবাস্তবতা। শহর আর গ্রামের এই যে সেতুবন্ধন, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এই যে সহাবস্থান এটাই আমাদের বাংলার আসল রূপ। সাকরাইন বেঁচে থাকবে মানুষের হাসিতে, গানের সুরে আর নীল আকাশের ওই উড্ডীয়মান রঙিন ঘুড়ির ডানায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে যাবে, জীবনটা আসলে একটা বিশাল আকাশের মতো, যেখানে আমাদের সবারই নিজের মতো করে ডানা মেলার অধিকার আছে।