সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নাগরিক সমাজ কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন দেখতে চায় না, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা দেখতে চায় বলে জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বিচার, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে থাকা দরকার বলে মনে করে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ১৫টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে এসব প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পরও গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে গত ১৫ বছরে দেশে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারার বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র মেরামতের এক নতুন সূচনার নাম। এ গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ প্রণীত হয়েছে। এটি জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ফসল এবং একটি সামাজিক চুক্তি। তাই দলগুলোর ইশতেহারে এই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও সময়বদ্ধ অঙ্গীকার থাকতে হবে।
যা আছে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাবে : সুজন ১৫ দফা প্রস্তারে মধ্যে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ পূর্ণ বাস্তবায়ন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ, বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন ও মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করা। এ ছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমারেখা স্পষ্ট করা, সংসদের কার্যকর নজরদারি, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং আত্মমর্যাদাশীল ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনীতির অবক্ষয় দূর না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। জনগণ এখন আর শুধু আশ্বাসে বিশ্বাস করে নাÑ তারা জানতে চায় কে কী সংস্কার করবে, কীভাবে করবে এবং কত সময়ের মধ্যে করবে।