প্রশ্নের মুখে প্রশাসনের সক্ষমতা

২০২৪ ও ২০২৫ সালে কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শেষ দেড় বছরে ঘটেছে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের ঘটনা। এসব ঘটনায় হতাহত হয়েছেন শ শ মানুষ। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করেও ইতিমধ্যে একাধিক ঘটনা ঘটেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আতঙ্কিত প্রার্থীরাও। তারা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। কারণ, ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র দিয়েই বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হচ্ছে। কিন্তু জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে সংঘাত-সহিংসতা নির্মূলে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই প্রশাসনের সক্ষমতাই প্রশ্নবিদ্ধ।

সিভিল সার্জন অফিস, সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে আলোচ্য সময়ে জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটা খণ্ডচিত্র পাওয়া গেছে। আলোচ্য দুই বছরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ৫৬১টি মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৫১টি ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ। ২৩৪টি আত্মহত্যাজনিত এবং ৭৬টি মরদেহ ছিল হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তির। এর বাইরে আরও অর্ধশতাধিক মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে রাজশাহী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে মারা যাওয়া আরও দুই শতাধিক মরদেহ।

গোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানায়, গত ১৮ মাসে জেলার সড়ক-মহাসড়ক, রেল লাইনের আশপাশে, নির্জন মাঠে এবং পানিতে ভাসমান অবস্থা থেকে অর্ধ শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয় যার সবকটিই হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘নিষ্ক্রিয়তা’ ও ‘নমনীয় অবস্থানের’ সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুষ্টিয়ার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম টুকু বলেন, ‘পুলিশ যদি স্বাভাবিক নিয়মে কাজের নিশ্চয়তা পেত তাহলে হয়তো খুব শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হতো। কিন্তু পুলিশ সেটা পারছে না। আসলে তারাও নিরাপত্তাহীনতায় আছে। বেআইনি বিক্ষোভ বা মবের ভয়ে তারা নিষ্ক্রিয় থাকে।’

এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন সংকটময় পরিস্থিতির উত্তরণ না হলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন প্রার্থীরা। কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের জামায়াত প্রার্থী আমীর হামজা বলেন, ‘আপনারা ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছেন, থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র দিয়েই জেলার বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটছে। এসব অস্ত্রধারী জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে অবগত করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবারই অস্ত্র উদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও কোনো সফল উদ্যোগ দেখছি না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি প্রশাসন যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে জনমনের আতঙ্ক দূর করবে। তবেই কেবল শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হবে।’

কুষ্টিয়া-৪ আসনের (খোকসা-কুমারখালী) বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তিত একটা পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করেই ভোটারদের শঙ্কা দূর করতে হবে।’

জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে মন্তব্য জানতে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীনকে গত ৩ দিন ধরে মোবাইফোনে অসংখ্যবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। কল রিসিভের অনুরোধ করে খুদে বার্তা দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) হাসান ইমাম বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রার্থীদের শঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে যা কিছু করার তার সবই পুলিশ করছে। আশপাশের জেলাগুলোর তুলনায় কুষ্টিয়ার পরিস্থিতি অনেক ভালো। ফলে এসব নিয়ে শঙ্কা বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনকে উৎসবমুখর সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করার সব রকম আয়োজন কমিশনের পক্ষ থেকে নেওয়া হবে। প্রার্থীদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’