টেকসই সমৃদ্ধি স্মার্ট কৃষি ক্ষুদ্র অর্থায়ন

বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন হচ্ছে কৃষি। জিডিপিতে কৃষির অবদান বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ হলেও, এর সামাজিক ও কাঠামোগত গুরুত্ব আজও অপরিসীম। দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সরাসরি দেশের মাটির সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক বীজ, সার, সেচ ব্যবস্থা এবং যান্ত্রিকীকরণের স্পর্শে কৃষি এখন আদিম রূপ ছেড়ে বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করছে। তবে এমন অগ্রযাত্রার পথে কৃষকের সবচেয়ে বড় বাধা হলো পুঁজি। প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের একটি বিশাল অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে। প্রথাগত ব্যাংকের কঠোর নিয়মকানুন, জামানতের বাধ্যবাধকতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাধারণ কৃষক প্রায়ই পুঁজি সংকটে ভোগে। এই শূন্যস্থান পূরণে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অর্থায়ন এক শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৃষি উৎপাদনশীলতার পথে যে আর্থিক বাধার দেয়াল ছিল, ক্ষুদ্র অর্থায়ন তা বহুলাংশে শিথিল করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অর্থায়নের বিস্তার ও কৃষি : সত্তরের দশকে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র অর্থায়নের সূচনা হয়েছিল মূলত ভূমিহীন দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে, এটি কেবল হাঁস-মুরগি পালন বা কুটির শিল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষি খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএস-এর মতো কয়েকশ ক্ষুদ্র অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান (MFI) এখন কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঘিরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির কাছাকাছি, যার উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি ও কৃষি-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত। ফসল উৎপাদন, সবজি চাষ, মৎস্য, পোলট্রি ও গবাদিপশু খাতে এই অর্থায়নের ব্যবহার প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

পরিসংখ্যান আয়নায় বর্তমান চিত্র : ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮০০-এর বেশি নিবন্ধিত এনজিও-এমএফআই কাজ করছে। বার্ষিক ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫,০০০ কোটি টাকার বেশি। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, বড় বড় শিল্পঋণের ক্ষেত্রে দেশে খেলাপি হওয়ার উচ্চ হার থাকলেও কৃষি ক্ষুদ্রঋণের আদায়ের হার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, প্রায় ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, প্রান্তিক কৃষক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সৎ এবং তারা এই পুঁজির সঠিক ব্যবহার করতে সক্ষম।

ক্ষুদ্র অর্থায়নের অপার সম্ভাবনা : কৃষিতে ক্ষুদ্র অর্থায়ন আজ শুধু ঋণের জোগান নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমাত্রিক রূপান্তরের একটি কার্যকর হাতিয়ার। সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ায় কৃষকরা প্রথাগত চাষাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে পাওয়ার টিলার, সেচ পাম্প ও আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোন প্রযুক্তিসহ স্মার্ট এগ্রিকালচার টুলসের জন্যও ঋণ সুবিধা চালু হওয়ায়, উৎপাদনে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে ধাননির্ভর চাষ থেকে সরে এসে সবজি, ফল ও ফুলের মতো উচ্চমূল্যের ফসলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী হওয়ায় গবাদিপশু ও মৎস্য খাতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। সঞ্চয় কর্মসূচি ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে প্রান্তিক কৃষকরাও দ্রুত আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি পাচ্ছে নতুন গতি।

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও সহনশীল কৃষি : বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আকস্মিক বন্যা, খরা বা লোনা পানির অনুপ্রবেশে প্রান্তিক কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অর্থায়ন এখন কেবল উৎপাদন নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রসারে বিনিয়োগ করছে। খরা-সহিষ্ণু বা লবণাক্ততা-সহিষ্ণু বীজ কেনা, ভাসমান সবজি চাষ এবং দুর্যোগ পরবর্তী জরুরি কৃষি পুনর্বাসনে ক্ষুদ্রঋণ কৃষকের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হলে এই ঋণের উচ্চ সুদের কিস্তি পরিশোধ কৃষকের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায়।

বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা : কৃষিতে ক্ষুদ্র অর্থায়নের সম্ভাবনা সত্ত্বেও কয়েকটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কৃষকের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো উচ্চ সুদের হার, কার্যকরভাবে অনেক ক্ষেত্রে ২৪-২৫ শতাংশে পৌঁছে, যা কৃষির মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতের জন্য টেকসই নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারদরের পতনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য এই ঋণ পরিশোধ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই সে ঋণচক্রে আটকে যায়। একই সঙ্গে কৃষিতে যেখানে ফসল উৎপাদনে কয়েক মাস সময় লাগে, সেখানে সাপ্তাহিক কিস্তিতে তাৎক্ষণিক ঋণ পরিশোধের চাপ কৃষকের জন্য মারাত্মক আর্থিক ও মানসিক বোঝা সৃষ্টি করে। উপরন্তু ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ, সংরক্ষণ অবকাঠামো বা ভ্যালু চেইন উন্নয়নে ক্ষুদ্র অর্থায়নের ভূমিকা এখনো সীমিতই রয়ে গেছে, যা কৃষির দীর্ঘমেয়াদি  রূপান্তরকে মন্থর করে দিচ্ছে।

নীতিগত চ্যালেঞ্জসমূহ : কৃষি অর্থায়নকে টেকসই করতে নীতিনির্ধারকদের সামনে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্র অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কাঠামোর অভাবে প্রান্তিক কৃষকরা অনেক সময় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। স্মার্ট কৃষি ঋণ ধারণা সামনে এলেও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছাতে প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের অর্থ প্রকৃত কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, তা তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। উপরন্তু, কৃষি খাতের উচ্চ ঝুঁকির বিপরীতে দেশে কার্যকর কৃষি বীমা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় দুর্যোগকালে কৃষকের ঋণঝুঁকি কমানোর কোনো শক্ত সুরক্ষা কাঠামো এখনো অনুপস্থিত, যা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।

উত্তরণের পথ ও সুপারিশ : একটি কৃষকবান্ধব কৃষি অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রচলিত ঋণব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। সাপ্তাহিক কিস্তির পরিবর্তে, ফসলি চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এককালীন বা নমনীয় পরিশোধ ব্যবস্থা চালু করলে কৃষকের চাপ কমবে। উচ্চ সুদের হার কমাতে সরকারিভাবে ক্ষুদ্র অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পুনর্র্অথায়ন তহবিল বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে স্বল্পমূল্যে ঋণ দেওয়া সম্ভব হয়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে স্বল্প প্রিমিয়ামের ফসল বীমা সংযুক্ত করা জরুরি। তবে ঋণ বিতরণই শেষ কথা নয়; কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার সংযোগ ও ভ্যালু চেইন উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটানো গেলে ক্ষুদ্র অর্থায়ন কৃষকের টেকসই সমৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সর্বোপরি, কৃষিতে ক্ষুদ্র অর্থায়ন কোনো একমাত্র সমাধান নয়, তবে এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর শক্তি। দারিদ্র্য বিমোচনের গণ্ডি পেরিয়ে এখন প্রয়োজন এই অর্থায়ন ব্যবস্থাকে স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও বাজারভিত্তিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। জাতিসংঘ ঘোষিত SDG-2 (Zero Hunger) অর্জন এবং সরকারের Smart Bangladesh Vision 2041 বাস্তবায়নে লাভজনক ও সহনশীল কৃষি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। যদি ক্ষুদ্রঋণের উচ্চ সুদের হার যৌক্তিক করা যায়, কিস্তি পরিশোধ ব্যবস্থাকে ফসলি চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় এবং এর সঙ্গে কৃষি, বীমা ও ডিজিটাল তদারকি যুক্ত করা সম্ভব হয় তাহলে ক্ষুদ্র অর্থায়ন কৃষকদের জন্য বোঝা নয়, সম্ভাবনার সোপানে পরিণত হবে। সঠিক নীতিগত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই ২০৩০ সালের ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়বদ্ধতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। মনে রাখা দরকার আমাদের আদি পরিচয় যেন আমাদেরই অবহেলা ও দুর্নীতিতে হারিয়ে না যায়।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষক

jasim6809786@gmail.com