ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় যখন ঘনিয়ে আসছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ততই বাড়ছে। যা একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের মতো। এ কারণে হিন্দু সম্প্রদায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। হিন্দুদের ভোটকেন্দ্রে নিতে হলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মনোবল ফেরাতে হবে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে এ কথা বলেন।
‘দেশে বিভিন্ন জায়গায় নৃশংস ও পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও লুটপাটের প্রতিবাদে এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্থাপনা, ঘরবাড়ি, মন্দির ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে’ সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।
পলাশ কান্তি দে বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে এসে যদি দেখি আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে হিন্দু সম্প্রদায় কীভাবে, কোন নিশ্চয়তার বলে, সরকার আমাদের কোন নিশ্চয়তা দিচ্ছে, যে ভোটকেদ্রে গেলে সংখ্যালঘু নির্যাতন হবে না। কেন্দ্র্রে যাওয়ার আগে সরকারের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা চাই।’ তিনি বলেন, ‘অতীতে দেখেছি নির্বাচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন বেশি হয়। এবার আশঙ্কা করছি আর বেশি হতে পারে। কারণ তফসিল ঘোষণার পর কতগুলো হত্যা হয়েছে! চট্টগ্রামের ১২ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে ধর্ষণের পর চুল বেঁধে পেটানো হয়েছে। ৯-১০ জনকে পিটিয়ে হত্যা করে কোনো কোনো জায়গায় আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ৫টি বাড়িতে বাইরে থেকে তালা মেরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রতিটি জায়গায় গিয়ে দেখেছি। দেখে যা মনে হয়েছে, মধ্যযুগীয় কায়দা বলা যাবে না, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেভাবে সংখ্যালঘু নিধনে নেমেছিল, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমরা একাত্তরে ফিরে গেছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব বলেন, ‘একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দেশকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র থেকে সাম্প্রদায়িক চরিত্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছে। যে ঘটনা আমরা উল্লেখ করেছি, ধর্মীয় কারণে এই নির্যাতন গুলো হয়েছে।’
তিনি বলেন, হিন্দু সম্প্রদায় যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে সেজন্য প্রধান নিবাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছি। সেগুলো হলো, নির্বাচনের ১০ দিন আগে থেকে ১০ দিন পর পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসা, বাড়ি, মঠ, মন্দিরের নিরাপত্তা জোরদার করা; নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করা; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচার, সভা-সমাবেশ না করা; নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার না করা; যেসব আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হবে, সেই আসনে ভোট স্থগিত করা এবং তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া; নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অফিসে সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা, যেখানে আমরা দেশের কোথায় সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে বা হতে পারে, যা তাৎক্ষণিক জানাতে পারি। একইভাবে প্রতিটি জেলায় এ ধরনের মনিটরিং সেল গঠন করা। সংখ্যালঘু ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা। সরকারের কাছেও আমরা একই দাবি জানাচ্ছি। অন্যদিকে আগামী ২৩ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার দিনে একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের সভাপতি প্রভাস চন্দ্র রায়। আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য চন্দ্রশেখর সাহা। উপস্থিত ছিলেন হিন্দু মহাজোটের সিনিয়র সহসভাপতি ডিসি রায়, জগন্নাথ হালদার, যুগ্ম মহাসচিব সমীর সরকারসহ বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোটের নেতারা।