দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিট (১২৫ মেগাওয়াট) ২০২০ সাল থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আর তৃতীয় ইউনিট (২৭৫ মেগাওয়াট) গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। অবশ্য প্রথম ইউনিট (১২৫ মেগাওয়াট) ১৫ দিন বন্ধ থাকার পর গত ১৪ জানুয়ারি থেকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। তবে এই ইউনিট থেকে মাত্র ৫০ থেকে ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রটির মোট ৪০০ থেকে ৪৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উত্তরাঞ্চলসহ জাতীয় গ্রিডে।
কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জানিয়েছেন, তৃতীয় ইউনিটের মেরামতকাজ চলমান রয়েছে এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ওই ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, চুক্তির সময়ের তুলনায় যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতে গড়িমসি করছে।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রথম ইউনিটটি বহুদিনের পুরনো। গত ৩০ ডিসেম্বর বয়লারের টিউব ফেটে যাওয়ায় এই ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। বহু কষ্টে ৪৮টি লিক ওয়েল্ডিং মেরামতের পর গত ১৪ জানুয়ারি রাত ১০টার পর এটি পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে উৎপাদন শুরু করবে।
কেন্দ্রের একটি সূত্র জানায়, চীনা প্রতিষ্ঠান হারবিন কোম্পানি তৃতীয় ইউনিটের মেরামতকাজ করেছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৩ কোটি ৮২ লাখ ৫৬ হাজার ১৫৪ টাকা।
কেন্দ্রের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, তেল সরবরাহের জন্য প্রতিটি ইউনিটে দুটি ওয়েল পাম্প প্রয়োজন। ২০২২ সালে একটি ওয়েল পাম্প নষ্ট হয়ে যায়। একটি পাম্প দিয়েই ইউনিট চালু রাখা হয়েছিল, কিন্তু সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে। করোনার পর থেকে যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে ত্রুটি মেরামত করছে না।
তিনি আরও জানান, ত্রুটি মেরামত ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হারবিন ইলেকট্রিক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে, কিন্তু তারা এখনো কাজ শুরু করেনি। এই ইউনিট নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিএমসি-এক্সএমসি কোম্পানির সঙ্গে ওভারহোলিংয়ের চুক্তি হয়েছে, কিন্তু তারাও কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। করোনার পর জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে তারা অতিরিক্ত দামের দাবি তুলেছে।
উল্লেখ্য, দেশীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা মিলিয়ে ১ হাজার ৬৩৪ কোটি ৮৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০০৬ সালে চীনা কারিগরি সহায়তায় দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পাশে দুটি ইউনিট (প্রতিটি ১২৫ মেগাওয়াট) মিলিয়ে ২৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই চীনা জয়েন্ট ভেঞ্চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (হারবিন ইলেকট্রিক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও পিআর চায়না) তিন বছর মেয়াদি সম্প্রসারণ প্রকল্পের (২৭৫ মেগাওয়াট
তৃতীয় ইউনিট) কাজ শুরু করে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই এই ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে এই ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। এতে উত্তরাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর প্রত্যাশা ছিল।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৭ ডিসেম্বর পুরনো ১৪০৬ ফেজের কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন ১৩০৯ ফেজে আগামী মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে কয়লা উত্তোলন শুরু হবে। বর্তমানে কয়লা খনির কোল ইয়ার্ডে ৫ লাখ টনের বেশি কয়লা মজুদ রয়েছে।