ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের আদানী গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়েছিলো তাতে ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতির শক্ত প্রমাণ পেয়েছে এ সংক্রান্ত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে জমা হতে পারে। যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী এই চুক্তি বাতিল অথবা আদানির সঙ্গে বিদ্যুতের নতুন দর নির্ধারনের সুপারিশ করা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তবে চুক্তি বাতিল করাও বেশ কঠিন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। হেরে গেলে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হতে পারে। সরকার অবশ্য এ বিষয় নিয়েও ভাবছে।
কমিটির এক সদস্য সতর্ক করে বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন না করে আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করলে জরিমানাসহ নানান জটিলতার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে ভূরাজনীতির বিষয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে অনেকের।
এসব বিবেচনায় চুক্তি বাতিল না করে আদানির সঙ্গে বিদ্যুতের দাম নিয়ে দর কষাকষি করতে পারে বলে সূত্র আভাস দিয়েছে। এজন্য আদানি বিদ্যুৎ বন্ধ রাখলে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোরও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কমিটি এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) আদানি পাওয়ারকে অর্থ পরিশোধ বন্ধ রাখার কথা বলেছে।
মন্ত্রনালয়ের সূত্র অনুযায়ী, আদানিকে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। আদানির দাবি, তাদের বকেয়া প্রায় ৬০ কোটি ৭০ লাখ ডলার, অন্যদিকে বিপিডিবির হিসাবে বকেয়ার পরিমাণ ৩৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি গত বছরের নভেম্বরে জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিটি তখন জানিয়েছিল, আদানিসহ বড় বিদ্যুৎ চুক্তিগুলোর অনেকটিতেই গুরুতর অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি ঘটেছে। দুর্নীতির কারণে বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ আর ভর্তুকি তুলে নিলে ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, আদানির চুক্তিতে যদি কোনোরকম অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে বাতিল করতে দ্বিধা করব না। তবে যথাযথ কারণ থাকতে হবে।
চুক্তির পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা: গত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর পিডিবির সঙ্গে নিজেদের মতো করে একতরফা চুক্তি সই করে পিডিবি। ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যের গড্ডায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে আদানি, যার সব বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়। এ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৫ বছর ধরে কিনবে বাংলাদেশ। গত সোমবার রাত ৮টায় কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছে বলে পিডিবি জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রমতে, আদানির চুক্তিতে কয়লার দাম নির্ধারণে বাংলাদেশের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, অন্য কেন্দ্রগুলোর তুলনায় প্রতি টন কয়লায় ১০ থেকে ১২ ডলার বেশি দিতে হচ্ছে, বছরে প্রায় ২০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করছে।
এ প্রসঙ্গে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমতুল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে আদানির সরবরাহ করা বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলেও খুব বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু বিদ্যুৎ বন্ধ করলেও তাদের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ঠিকই দিতে হবে। এটা দেশের জন্য বড় ক্ষতি।’
চুক্তিটিকে একতরফা ও অবৈধ আখ্যায়িত করে এ বিশেষজ্ঞ বলছেন, প্রতিযোগিতা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প তো এমনিতেই বাতিল হওয়ার কথা। উল্টো আদানির কাছে বাংলাদেশের ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত। আদানির বিরুদ্ধে ভারতেও পরিবেশের ক্ষতি করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তারা যদি আন্তর্জাতিক আদালতে যায়, তাহলে বাংলাদেশ জিতবে বলে আশা করেন তিনি।
২০১৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী, আদানি পাওয়ারের ১,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র তার উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০০ শতাংশ ২৫ বছরের জন্য বাংলাদেশে সরবরাহ করে। এমনকি বিদ্যুৎ না নিলেও বিপিডিবিকে বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়।
কর্মকর্তারা জানান, এই চুক্তি দেশের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, আমদানিকৃত বিদ্যুৎ থেকে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা শুধু আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার কারণে। বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হোক বা না হোক, প্রতি মাসে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়।
আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি।
চলতি বছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ১২.১৬ মার্কিন সেন্ট, যেখানে অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা ১১.৩০ সেন্ট।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আদানি প্রতি টন কয়লার জন্য গড়ে ৭৬.৯১ ডলার নিয়েছে, যেখানে অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা ৭১.৭৬ ডলার। আদানি তাদের নিজস্ব অস্ট্রেলিয়ান খনি থেকে কয়লা সরবরাহ করে এবং আন্তর্জাতিক সূচক ব্যবহার করে দাম নির্ধারণ করে, যা বিপিডিবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই বিরোধের জেরে আদানি সিঙ্গাপুরে সালিশি মামলা করেছে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, আইনি বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আসন্ন গ্রীষ্মকালেও আদানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বড় দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রসহ বিকল্প উৎস প্রস্তুত রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।