আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে হিসাবে ভোটের বাকি মাত্র ২১ দিন। এখনো ভোটের মাঠে থাকা রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন অংশ নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কথা বলে যাচ্ছে ঘরে-বাইরে। ভোটে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ আনছে নিয়মিত। একমাত্র বিএনপি ভোটকেন্দ্রিক সমালোচনা ও অনিশ্চয়তার কথা বলছে না। নির্বাচনের ঠিক আগে ভোট ঘিরে নানা অভিযোগ সাধারণ মানুষের ভেতরে সন্দেহ-সংশয় তৈরি করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের সমাজের একটি অংশ চায় না নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হোক।’ গতকাল মঙ্গলবার পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় নির্বাচন প্রসঙ্গে এ মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। এই মুহূর্তে তার এ বক্তব্যও সাধারণ মানুষের কাছে ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত রবিবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ এনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, এ নির্বাচনে আমরা অংশ নেব কি না, সেটি বিবেচনা করার সময় এসেছে। রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দল বা জনগণের যে কনফিডেন্স অর্জনের কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের, তা হারিয়েছে তারা।’ এ ধরনের বক্তব্য জনআকাক্সক্ষার ভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নির্বাচন সন্নিকটে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত করে তুলছে। জুলাই-আগস্ট পক্ষের অন্যতম শক্তি জামায়াতও সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নির্বাচনে অনিশ্চয়তার কথা বলে আসছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও একাধিক রাজনৈতিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভোটের অনিশ্চয়তার কথা বলে নিজেদের শক্তির কথাই জানান দিচ্ছে দলগুলো। সব রাজনৈতিক দলই নিজেদের উইন পার্টি মনে করে, জাতিকে সে বার্তা দিতে চায় তারা। তারা বলেন, সরকারের ভেতর একটি অংশ রয়েছে যারা ক্ষমতা উপভোগ করছেন। নির্বাচন হয়ে গেলে সরকারের ওই অংশের ক্ষমতা ভোগ ও উপভোগের ব্যাপারটি আর থাকবে না। ভোগ-বিলাসীরাই অনিশ্চয়তা দেখছে, দেখাচ্ছে। তবে সরকার ও রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনকেন্দ্রিক বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা-সন্দেহ থাকতেই পারে। তবে নির্বাচন হতেই হবে। এর বিকল্প নেই।’ নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার বক্তব্য আসার একাধিক কারণ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি কারণ, এ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এবারের নির্বাচনে সব দলই নিজেদের উইনিং পার্টি মনে করে। কিন্তু নির্বাচনে সব দল তো বিজয়ী হবে না, সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পাবে একটি দল।’
বদিউল আলম বলেন, ‘সবাই জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। তবে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে গেলে আমরা সবাই সংকটে পড়ব।’
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের ভেতর যে বা যারা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলছেন, তারা বাস্তব কথাই বলছেন। আমরা সরকারের বাইরে, দূরে থেকেও অনিশ্চয়তা বুঝতে পারছি।’ তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়ে যাওয়া জরুরি। নির্বাচন ব্যাহত হলে দেশ ও দেশের মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ে যাবে।’
রুহিন বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলার আরও দুটি কারণ থাকতে পারে। যারা সরকারে আছে তারা ভোগ-বিলাস ত্যাগ করতে চায় না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আছে, যারা মনে করে নির্বাচন ছাড়াই তো ক্ষমতায় আছি। নির্বাচন কেন হতে হবে। ভোগ-বিলাসী চিন্তায় যারা মগ্ন, তারা নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কথা বলেন। এ অবস্থায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনমুখী কার্যক্রম বেশি করে দৃশ্যমান করতে হবে।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা মহলের বিভিন্ন খেলাধুলায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন একটি গ্যাঁড়াকলে পড়েছে, নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ অনিশ্চয়তা দেখানো হবে জনগণকে।’