দেশের ভোটে বিশেষ নজর বিদেশিদের

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নেমে গেছে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীরা। ভোটের দিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালটের লড়াইয়ের আগেই ভোটারদের মন জয়ে জোর প্রচার শুরু হয়েছে। দূরের সীমান্তবর্তী জেলা থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত দিন-রাতের জনসভায় শীর্ষ নেতারা দলের মূল ইস্যুগুলো সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরছেন। পাশাপাশি নিজেদের প্রচারের ধরন-ধারণ কেমন হতে পারে, তা দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলকে ঘায়েল করার চেষ্টাও শুরু হয়েছে। সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে আসনে আসনে প্রার্থীরাও হেঁটে, উঠান বৈঠকে ও ছোট-বড় সমাবেশে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

অন্যদিকে, তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখছে বিদেশিরা। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঢাকায় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার মিশনপ্রধানরা কথা বলেছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দূতাবাস, স্থানীয় মিশন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা খোঁজ নিচ্ছেন। এ কাজে কিছু মিশনের নির্ভরতা স্থানীয় ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ওপর।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোটের ফল যে দলের পক্ষেই যাক, নতুন সম্ভাব্য সরকার ও বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি বুঝে তার সঙ্গে নিজ দেশের প্রয়োজন ও স্বার্থের দিকগুলোয় খাপ খাওয়াতেই বিদেশিদের এ তৎপরতা।

এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে তার পরিণতি কী হয়, তা বিদেশিরা বুঝতে পেরেছে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তার আঁচ তাদের গায়েও লাগে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে তারা তৎপর।’

বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়, এটা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগের মতো অস্থিরতা থাকলে চলবে না, এটা প্রায় সব দেশ মনে করে। স্থিতিশীলতা আসুক, এটা সবাই চায়। আর স্থিতিশীলতার সূচনা হতে হবে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে।

প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিক প্রচারের প্রথম দিন ছিল গত বৃহস্পতিবার। গতকাল শুক্রবার ছিল দ্বিতীয় দিন। দুদিনই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কমবেশি শান্তিপূর্ণ থাকায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি দেখছেন দেশি-বিদেশি কূটনীতিক, পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা।

প্রচারের প্রথম দুদিন সিলেট থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের, ঢাকা ও পঞ্চগড়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এবং এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলামের জনসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ওপর তীক্ষè নজর ছিল বিদেশি মিশন ও পর্যবেক্ষকদের। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা ইউরোপের একটি দেশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাগরিক গতকাল ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমান ও আগের দিন বৃহস্পতিবার ঢাকা-১৫ আসনে ডা. শফিকুর রহমানের জনসভার বক্তব্য শুনেছেন। দেশ রূপান্তরকে গতকাল তিনি বলেন, “দলগুলোর প্রধানরা প্রচারে ‘একটি ধাঁচ দাঁড় করানোর’ চেষ্টা করছেন। সতর্কতার সঙ্গে কিছু ইস্যু সামনে আনছেন। কিছু প্রতিশ্রুতি ভোটারদের দিচ্ছেন। তবে তাদের মধ্যে একধরনের সতর্কতা কাজ করছে।” তিনি বলেন, প্রচারে নিজ নিজ দলীয় কর্মসূচি তুলে ধরা হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর গণভোটের বিষয়টি প্রথম দুদিনের প্রচারে কম এসেছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি রাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক এবার নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখবেন। এর মধ্যে অন্তত দুজন করে পর্যবেক্ষক ৬৪টি জেলার সবগুলোর ওপর নজর রাখতে শুরু করেছেন। ইইউভুক্ত পর্যবেক্ষক ছাড়াও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমেও ইউরোপীয়রা খোঁজখবর নিচ্ছেন। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাতজন মিশনপ্রধান গত সপ্তাহে বিএনপিপ্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বাংলাদেশের জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়ে ইইউ সদস্যদের আগ্রহ রয়েছে। কমনওয়েলথও ১৪ সদস্যের একটি নির্বাচক দল পাঠানোর কথা জানায়।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। বিএনপিপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড পেজে এক পোস্টে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে রাষ্ট্রদূত সাক্ষাৎ করেন। যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক চলতি জানুয়ারিতে বিএনপি ও জামায়াত প্রধানদের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। হাইকমিশনার বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী উৎসাহ পুনর্ব্যক্ত করেন।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলামের সঙ্গেও এর আগে সাক্ষাৎ করে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য তাদের নিজ নিজ দেশের আগ্রহের কথা জানান।

দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের ওপর প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সরকারগুলোর তীক্ষè নজর রয়েছে।

টানা প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন ও তার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কে স্থবিরতা নেমে আসে। ভারত সরকার আশা করছে, নির্বাচনের মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি হবে। ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাও সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর বাইরে ভারতীয় কূটনীতিকরা জামায়াতপ্রধান ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা সেই নির্বাচনে তাদের শুভকামনা জানাই।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে এ অঞ্চলে প্রতিবেশীসুলভ অনুভূতি বাড়বে।

ঢাকা, ইসলামাবাদ ও করাচির কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তান সরকার ও সেখানকার নাগরিকদের বেশ আগ্রহ আছে। তারা বোঝার চেষ্টা করছেন, কোন দল ক্ষমতায় আসতে পারে যাদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো হবে।