নির্বাচন ও প্রান্তিক মানুষের ভাবনা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাতাস, বেশ কয়েক মাস ধরে জোরালোভাবে বইতে শুরু করেছে, টের পাচ্ছে বিশ^বাসীও। অনেকে একক অথবা জোটগতভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। নতুন ভোটারও এবার ভোট দিতে পারবেন বলে আশায় বুক বেঁধেছেন। দেশে একটি নির্বাচন হয়ে যাক, এটা গড়পড়তা প্রত্যাশা। নির্বাচনী হাওয়া গায়ে মাখাতে সবাই যখন ব্যস্ত, তখন প্রতিবার ও বরাবরের মতো উপেক্ষিত থাকছে, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গ। এর আগে যত নির্বাচন হয়েছে, কোনোটাতেই তেমন কোনো প্রতিনিধিত্ব ওঠে আসেনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে। ফলাফল কী হয়েছে? প্রান্তিকরা প্রান্তিকই থেকে গেছেন। যদিও সামান্য কিছু কাজ হয়েছে। তা তো হতেই হবে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে, ভোটে জিততে এসব করতে হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রগতি ও সত্যিকারের ভালো কী হয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর? মূলত এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি যারা হয়েছেন, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারে, তারা কি সত্যিকারের ভালো কাজ করেছেন নিজেদের জনগোষ্ঠীর জন্য? উল্লেখযোগ্য উদাহরণ চোখে পড়ে না। উল্টো কী হয়েছে? নির্মমভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, নির্লজ্জভাবে তারা নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। এমনকি তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে কাজ করেছেন। তাহলে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজের জন্য, নিজেদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার কাজ আগামী সংসদে কি হচ্ছে? যদি না হয়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে ভাবতে হবে, স্থানীয় সরকার নিয়ে। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভালোবাসেন বলে দাবি করেন, তাদের ওপর ভরসা করে আর কতদিন থাকা যায়? অতীতে এর প্রমাণ আমরা দেখেছি। যতটুকু পেয়েছি বলে অনেকে বলবেন, সেই পাওয়াটা কার পক্ষে গেছে? সেটা কি একক কোনো ব্যক্তির নাকি গোষ্ঠীগত? প্রশ্ন থাকল, উত্তর আপনি খুঁজে নিন। আমাকে আর কিছু বলতে হবে না। 

প্রকৃত অর্থে করণীয় হচ্ছে, বৃহৎ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেই। সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক লেখাপড়া ও বোঝাপড়া থেকে শুরু করে, সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে রাজনৈতিক সংগঠন ও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নিজেরা এককভাবে রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গড়ল, পরবর্তীকালে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে ঐক্য গড়ল। একেবারে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়, এমনকি বৈশ্বিক পর্যায় পর্যন্ত, সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গঠন এবং পরবর্তীকালে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, জয়ী হওয়া ও প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে যাবতীয় করণীয় নিয়ে, বেশ গুরুত্ব দিয়েই ভাবতে হবে এবং অনিবার্যভাবে এসবের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীরা মিলে একটি রাজনৈতিক সংগঠন ও পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াগতভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারে। এক্ষেত্রে সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীরা আলাদা করেও দল গঠন করতে পারে। ওদিকে ধরা যাক, চা শ্রমিকরা নিজেরা একটা রাজনৈতিক সংগঠন ও পরে রাজনৈতিক দল গঠন করল। আবার আরেক দিকে, বেদে অথবা কায়পুত্ররা বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা বা হরিজনরা একইভাবে রাজনৈতিক সংগঠন ও পরে রাজনৈতিক দল গঠন করল। পরে পর্যায়ক্রমে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে, বৃহৎ ঐক্য বা জোট গঠন করতে পারে। এই ঐক্য বা জোট, স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এমনকি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও, প্রতিনিধিত্ব করবে ন্যায্যতাভিত্তিক সমতায়।

এখানে কথা আছে। স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব মানে কি, শুধু নিজেদের ভালো করা? একদমই না। ভাবনায় বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিলে চলবে না। কেননা প্রতিনিধি হলে তো, সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে, নিজের এলাকায় তো বটেই, জাতীয় পর্যায় নিয়েও ভাবতে হবে। অর্থাৎ দেশের জন্য ভাবতে হবে এবং কাজ করতে হবে। ভাবতে হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন অঞ্চলের, প্রান্তিক ও মূলধারার জনগোষ্ঠীগুলোর ভালোর জন্য। ভাবতে হবে গোটা বিশ^ব্রহ্মাণ্ডের জন্য। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে, এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর প্রার্থীদের, বাঙালিরা সমর্থন করবেন কিনা ও ভোট দেবেন কিনা। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, প্রাথমিক অবস্থায় দেবে না। একেবারেই যে কেউই দেবে না, তা না। তবে সেই সংখ্যা ধর্তব্য নয়। এ কারণেই বৃহৎ কর্মসূচির কথা বলেছি, যেসব কর্মসূচি রাজনৈতিক লেখাপড়ার ও বোঝাপড়ার। যেসব কর্মসূচি রাজনৈতিক সংগঠন ও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের। দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের ভালো চাইলে, নিজেদের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে, এই পথেই অগ্রসর হতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এই পথকেই সেরা উপায় বলে মনে করছি। এসব করতে করতে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আন্তরিকভাবেই সুচিন্তা ও কাজ করে, তাহলে সেটা খুবই ইতিবাচক। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যেন কেউ এক্ষেত্রে ফায়দা না নেয়। এবং এটাও নিশ্চিত করতে হবে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলো থেকে কেউ যেন ওইসব রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়ে কাজ না করে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোনোভাবে ইতিবাচক রাজনীতির পথে অগ্রসর হতে থাকে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করে ও প্রকৃত গোষ্ঠীবান্ধব কাজ করে, তাহলেও কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের হয়ে, নিজেদের জন্য প্রতিনিধিত্ব করার কাজ থেকে পিছিয়ে যাওয়া চলবে না। মোদ্দা কথা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল গঠন করে, স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। আমি নিশ্চিত, এমন ভাবনা অনেকেই ভাবেন। সময় এসেছে, শুধু এই ভাবনার কলেবরটা বড় করতে হবে। তাহলে আর সংশয় কীসের? সুতরাং, শুভস্য শীঘ্রম।

 লেখক : সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী

jewel.theotonius@gmail.com