তুষারঝড়ে স্থবির কানাডা: বিমানবন্দর থেকে রাজপথ—সবই এখন বরফের নিচে

কানাডার বেশিরভাগ এলাকায় তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও ভারী তুষারপাত জনজীবনকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছে। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, প্রবল বাতাস ও টানা তুষারপাতে সড়ক, আকাশপথ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ—সবকিছুতেই বড় ধরনের ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে।

দেশটির আবহাওয়া সংস্থা এনভায়রনমেন্ট কানাডা জানিয়েছে, একটি শক্তিশালী পোলার ভর্টেক্স বা মেরু ঘূর্ণির প্রভাবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে কানাডার বহু অঞ্চলে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতা তখনই দেওয়া হয়, যখন চরম আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক ব্যাঘাত বা মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাসকাচুয়ান প্রদেশের বেশিরভাগ এলাকায় রেকর্ড ভাঙা ঠান্ডা পড়েছে। এনভায়রনমেন্ট কানাডার আবহাওয়াবিদ ব্র্যাড ভ্রোলিক জানান, এই তাপমাত্রায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই খোলা ত্বক বরফে জমে যেতে পারে। সামান্য বাতাস থাকলেও পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

চরম ঠান্ডার কারণে সাসকাটুন শহর কর্তৃপক্ষ আগামী বুধবার পর্যন্ত তাদের শীতকালীন জরুরি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। একই সময়ে অন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন, গ্রেটার টরন্টো এলাকা এবং কিচেনার-ওয়াটারলু অঞ্চলে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাতের আশঙ্কায় বাসিন্দাদের ঘরে থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তবে সতর্কতার পরও দুর্ঘটনা থামেনি। অন্টারিও প্রাদেশিক পুলিশ জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওতে ৫০টির বেশি গাড়ি দুর্ঘটনায় তারা সাড়া দিয়েছে।

গ্রেটার টরন্টো এলাকার জন্যও অরেঞ্জ সতর্কতা জারি রয়েছে। এনভায়রনমেন্ট কানাডা জানিয়েছে, ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে, যার ফলে দৃশ্যমানতা অনেক কমে যাবে। রাতের দিকে ধীরে ধীরে এই আবহাওয়া সরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

চরম আবহাওয়ার বড় প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও। টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ও রবিবারের মধ্যে আগমন ও বহির্গমন মিলিয়ে ৬০ শতাংশের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ ফ্লাইট দেরিতে চলেছে।

কানাডার রাজধানী অটোয়ায় রবিবার দিনভর প্রায় ২০ সেন্টিমিটার তুষারপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে এনভায়রনমেন্ট কানাডা। সোমবার সকাল নাগাদ তা হালকা তুষারঝরে রূপ নিতে পারে। এই কারণে অটোয়া সিটি কর্তৃপক্ষ সোমবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সড়কে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধ করেছে।

কিংস্টন শহর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাসিন্দাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং জানানো হয়েছে, তীব্র ঠান্ডা ও তুষারপাতের কারণে সড়ক ও ফুটপাত পরিষ্কারের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে।

কুইবেক প্রদেশেও পরিস্থিতি গুরুতর। মন্ট্রিয়াল দ্বীপের উপশহর কোট সাঁ-লুক এলাকায় শনিবার হাজারো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়লে কানাডিয়ান রেড ক্রস সেখানে একটি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে। হাইড্রো-কুইবেক জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে, তবে কিছু এলাকায় সোমবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

রবিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কোট সাঁ-লুক এলাকার বিদ্যুৎহীন ১৩ হাজার ৩৬৮টি বাড়ির মধ্যে ৩ হাজার ৭২৭টিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা গেছে। হাইড্রো-কুইবেকের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল থেকেই এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়। কোথাও যন্ত্রপাতির ত্রুটি, আবার কোথাও অজানা কারণকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডর প্রদেশেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রদেশটির সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বে দ’এসপোয়ারে বরফ অপসারণের কাজ সফল হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর হাইড্রো। প্রচণ্ড ঠান্ডা পানিতে ডুবুরিরা নেমে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে বরফ সরানোর কাজ করেন।

এর আগে, ফ্রাজিল আইস নামে পরিচিত পানিতে ভাসমান বরফকণার স্তর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানি প্রবেশপথ বন্ধ করে দিলে ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো পুরো কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।

রোববারও বিদ্যুৎ সতর্কতা বহাল ছিল। নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর হাইড্রো এবং নিউফাউন্ডল্যান্ড পাওয়ার গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অনুরোধ জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হতে পারে বলে প্রস্তুত থাকতে বলেছে।