বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি অপরাধ ও অন্যায় সংঘটিত হয়েছে সাতক্ষীরায়। দেশের অন্য কোনো জেলায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়নি। বুলডোজার দিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘তারা কি কোনো অপরাধ করেছিল?’
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভোট মানে দুটি পথ— হ্যাঁ এবং না। হ্যাঁ মানে স্বাধীনতা, না মানে পরাধীনতা।’ তিনি সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সরকার গঠনে জামায়াতকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি ২০১৫ সালে সাতক্ষীরায় এসেছিলেন কোনো ভ্রমণে নয়, বরং দ্বীনদার ও ঈমানদার ৪৫ জন শহীদের পরিবারের খোঁজ নিতে। তিনি বলেন, ‘যেসব মা-বোন বিধবা হয়েছেন, যেসব শিশু বাবাকে হারিয়ে অপেক্ষা করেছে— তাদের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে এসেছিলাম।’
তিনি জানান, নির্যাতিত যুবকদের কাটা হাত-পা ও মায়েদের চোখের পানি তিনি নিজ চোখে দেখেছেন।
তিনি বলেন, শহীদদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল আল্লাহকে ভালোবাসা ও তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া। ‘এই বিচার দুনিয়াতে না পেলেও ইনশাআল্লাহ আখিরাতে অবশ্যই বিচার পাওয়া যাবে,’ বলেন তিনি।
২০১৫ সালে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় সফরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, স্থানীয়রা তখন ব্যাপক বঞ্চনা ও অবহেলার কথা জানিয়েছিলেন। সরকার সাতক্ষীরাকে দেশের অংশ হিসেবেই গুরুত্ব দেয়নি। এই জেলার সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে— এমন অভিযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি দাবি করেন, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই সাতক্ষীরাকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যাকে চান সম্মান দেন, আর যাকে চান সম্মান কেড়ে নেন।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে নির্যাতিত রাজনৈতিক দল। আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছে, অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল করা হয়েছে, এমনকি দল নিষিদ্ধও করা হয়েছে।’
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫ তারিখে আল্লাহ যখন আমাদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তখন আমরা সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিশোধের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না।
তিনি জানান, দলের নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা যাবে না। সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে আমাদের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিতে জড়ায়নি, অন্যায় মামলা দেওয়া হয়নি। যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেন তিনি।
বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল, সাংবাদিক ও আলেম-ওলামারাও গত ১৫ বছরে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় জুলুমের শিকার মানুষই পরে জালিম হয়ে যায়। তাই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, মদিনা সনদের আদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো এবং দায়িত্ব অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
সমাবেশে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম মুকুলের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম।
এছাড়া ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আজিজুর রহমান।