আবাসিক হলে অবৈধভাবে সিট দখলের সংবাদ প্রকাশ করায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাংবাদিককে মারার হুমকি দিয়েছেন শাখা ছাত্রদলের একজন কর্মী। অভিযুক্ত সেই কর্মীর নাম সিফাতুল ইসলাম। তিনি শাখা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক সোয়া ১২টার দিকে এই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম এম. মিজানুর রহমান। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল স্টার নিউজ–এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) সদস্য।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এই সাংবাদিককে হুমকি দেন সিফাতুল ইসলাম। সংশ্লিষ্ট ফোনালাপের একটি অডিও রেকর্ড ইতোমধ্যে এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যা ভুক্তভোগী সাংবাদিকের কাছে সংরক্ষিত ছিল।
অডিও রেকর্ডে হুমকিদাতা নিজেকে ‘সালমান (আব্দুস সালাম সালমান)’ পরিচয় দিয়ে সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে তাকে মারধরের হুমকি দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আপনি যে নিউজ করলেন, আপনাকে এটার অনুমতি দিলো কে? …….. একেবারে ভাইঙ্গা দিমু। ফরহাদ হল থেইকা টাইন্না নিয়া নীড়া পাহাড়ে উডামু। এমন কোনো মাদারচোদ নাই যে আপনারে ঠেকাইবে।”
এ বিষয়ে সালমান পরিচয় দেওয়া সেই মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হয়। তবে একাধিকবার কল দিয়েও তার মন্তব্য নেওয়া যায় নি। তবে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে সালমান বলেন, “আমি হুমকি দেইনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।”
সাংবাদিককে হুমকি প্রদানের প্রকৃত অভিযুক্ত সিফাতুল ইসলাম। ঘটনার রাতে যে নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল এসেছিল, সেই নম্বরে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মো. সিফাতুল ইসলামের মোবাইল নম্বর বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়ে তাকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল দেওয়া হয়। তিনি সাড়া দেন নি। তবে এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, “আমি সাংবাদিকতা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। আমারে সাংবাদিকতা শিখাইলে হবে না। তার (সালমানের) অনুমতি ছাড়া কীভাবে একটা নিউজ করে? ওর বিরুদ্ধে বারবার নিউজ হইছে। এখন ওর তো মাথা গরম হইয়া গেছে।”
শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে অবস্থান করায় হল প্রশাসন কর্তৃক ইতোপূর্বে একাধিকবার হলত্যাগের নোটিশ দেওয়া হলেও আব্দুস সালাম সালমান (অভিযুক্ত সিফাতুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু) তা উপেক্ষা করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে। এই বিষয়ে স্টার নিউজের চবি প্রতিনিধি এম. মিজানুর রহমান সংবাদ প্রকাশ করেন। সালমানকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের জেরে সিফাত নিজেই সালমান সেজে সাংবাদিককে ফোন করে এই হুমকি দিয়েছেন।
জানতে চাইলে ভুক্তভোগী সাংবাদিক এম. মিজানুর রহমান বলেন, “চবির যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালমান দীর্ঘদিন ধরে শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে অবৈধভাবে অবস্থান করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গতকাল রাত সোয়া ১২টার দিকে সালমানের বন্ধু মো. সিফাতুল ইসলাম নিজেকে ‘সালমান’ পরিচয় দিয়ে আমার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করে আমাকে হল থেকে টেনে পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে মারার হুমকি দেন।”
তিনি আরও বলেন, “সংবাদের কোনো অংশে অসত্য থাকলে সংশোধনের অনুরোধ, প্রতিবাদলিপি প্রেরণ কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একজন সাংবাদিককে এভাবে প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ভয়াবহ আক্রমণ। এতে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। ইতোমধ্যেই আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।”
ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হলে অবৈধভাবে অবস্থান করা সালমান শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক দিনাজপুর–২ আসনে বিএনপির আসনভিত্তিক সমন্বয় কমিটির সদস্য বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমার এখনও কিছু জানা নেই। এটা আমি দেখতেছি।”
চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, “আমি এই বিষয়টি আগে জানতে পারিনি। ঘটনা সত্য হলে অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিবো।”
সাংবাদিককে এমন হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “এই বিষয়ে আমি এখন পর্যন্ত অবগত নই, বিষয়টা সম্পর্কে আমি খোঁজ নিচ্ছি।”
পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি প্রদানের ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ শুভ্র। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একজন সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করার যেকোনো অপচেষ্টা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আমরা হুমকিপ্রাপ্ত সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
হুমকির ঘটনায় চবির প্রক্টর অফিসে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, “স্টার নিউজের চবি প্রতিনিধি মিজানুর রহমান আমাদের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একটি সংবাদের জেরে একজন শিক্ষার্থী তাকে শারীরিকভাবে মারার হুমকি দিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহোদয়কে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”