প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতা

শিক্ষার মূল দর্শন হলো মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার বিকাশ, চরিত্র গঠন এবং জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ভালো ও চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয় বরং এটি মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরিতে সহায়তা করে। মূলত, প্রতিটি মানুষের মধ্যে থাকা সম্ভাবনা বা প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রাণের সংযোগ থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেই উদ্দেশ্য নেই। আসলে ‘অন্তর্গত শিক্ষা’ শুধু পাঠ্যগত জ্ঞান অর্জন নয় বরং সেই  শিক্ষার মাধ্যমে হৃদয় ও আত্মার বিকাশ ঘটে। অন্তর্গত সত্তার জাগরণ ঘটিয়ে, আত্মার বিকাশ ও মানবিকতাবোধের উদ্বোধন হয় প্রকৃত শিক্ষায়। ‘প্রতিযোগিতামূলক নয়, অনুসন্ধান ও অনুপ্রেরণামূলক শিক্ষায়’ বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমাদের প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। এরপর আসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ। যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক শিক্ষা পাওয়া যায়। এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয় ‘অন্তর্গত শিক্ষা’। এই শিক্ষাই একজন মানুষকে পরিচালিত করে। আমরা যা বলি, করি এবং অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি সেটিই একজন মানুষের পরিচয়। আমাদের অন্তর্গত শিক্ষা কোন মানের সেটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের আচরণের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়। ফলে নতুন করে সেটি ব্যাখ্যার দরকার নেই। আমরা যা চাই, তা রাজনীতি এবং রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে সামনে চলে আসে। ফলে সেই চাওয়া কোনো পূর্ণতা পায় না। বিশেষ করে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে বিশ্ববিচারে। দেশের বাইরে একটু চোখ মেললেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। ২০২১ সালের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০তম। যেটি দক্ষিণ এশিয়ায় নিম্নমানের শিক্ষার ইঙ্গিত দেয়। যদিও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৯৮% ভর্তি হার এবং লিঙ্গ সমতা অর্জিত হয়েছে, তবুও মানসম্মত শিক্ষার অভাব, মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের জবাবদিহির অভাব প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ২০২২ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে উল্লেখ রয়েছে ‘শিক্ষার গুণগতমান কমে যাওয়া দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়া। বেড়েছে পেরু, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে। এর মধ্যে ভিয়েতনামের অবস্থা সবচেয়ে ভালো।’

যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি সরকার বা কোনো দলীয় স্বার্থের তোষণ ও হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন তা অবধারিতভাবে শিক্ষার গুণগতমান হ্রাস করে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ, সেখানে গবেষণার মান ও শিক্ষার পরিবেশ অনেক উন্নত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিলে এর সত্যতা মিলবে। নিজেকে উন্নত এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একটি চাকরি বা অর্থ সংস্থানের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে যখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেট মুখ্য ভূমিকা পালন করে, তখন সেই শিক্ষা মানবিকতার চেয়ে নিজেকে বাঁচানোর কথা বলবে এটাই মূল কথা। এমন বাস্তবতার মধ্যে কখনো শিক্ষার মাধুর্য ধরা দেবে না, এটাই স্বাভাবিক। দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা প্রবেশ করেছি শিক্ষাবাণিজ্যে। এই অবস্থায় দেশের মানুষের জন্য মুক্তির পথের সন্ধান কে, কীভাবে করবে বলা কঠিন। তবে এটা ঠিক, শিক্ষাকে পরিপূর্ণ মানবিক কাঠামোর মধ্যে না আনতে পারলে, জাতির মুক্তি অসম্ভব। মানবিক সমাজ তখনই সম্ভব, আমরা যখন মানবিক শিক্ষায় নিজেকে উন্নত করব। সমাজের সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন তখনই বাস্তব রূপ নেবে, যখন আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হব।