'বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কায় খেললে বিসিসিআইয়ের ইগোতে লাগত'- ভারতীয় সাংবাদিক

বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে শুরু হওয়া এক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার ঘটনায় গিয়ে ঠেকেছে—এমনটাই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। পুরো ঘটনাপ্রবাহে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও ভারতের প্রভাব নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইপিএলের মিনি নিলাম থেকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। তবে ৩ জানুয়ারি বিসিসিআই সচিব দেবজিত সাইকিয়ার নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে ছেড়ে দিতে বলা হয়। বোর্ডের নির্দেশ মেনে কেকেআর মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও ফিজের সব ছবি সরিয়ে নেয়। এই ঘটনার পরই বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে ভারত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মোস্তাফিজের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ৪ জানুয়ারি আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-মেইলও পাঠায় বিসিবি। তবে তাতে কোনো ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ডকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় আইসিসি।

২১ জানুয়ারির আইসিসির জরুরি বোর্ড সভায় ভারতের পক্ষে অর্থাৎ বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৪টি, বাংলাদেশের পক্ষে ছিল মাত্র ২টি ভোট। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় কেবল পাকিস্তান। এরপর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে আইসিসি। 

এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। এমনকি ভারতীয় অনেক ক্রীড়া সাংবাদিকও বিষয়টিকে বিসিসিআই ও ভারতের অতিরিক্ত প্রভাবের ফল বলে মনে করছেন। ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক শারদা উগরা দ্যা ওয়ারের আলোচনায় স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তই ছিল পুরো ঘটনার সূচনা।

উগরার ভাষায়, “যখন একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে বাদ দিলেন, পরে বিষয়টা সামাল দিতে পারলেন না। পুরো বিষয়ে ভারতীয় বোর্ডের প্রভাব, আইসিসিতে ভারতের প্রভাব এবং অন্য বোর্ডগুলোর ওপর তাদের প্রভাবের কারণেই সবকিছু এই জায়গায় এসেছে। এখানে খুব পরিষ্কারভাবে পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে—বাংলাদেশ ভারতে আসতে চায়নি, তাই আইসিসি তাদের বাদ দিয়েছে।”

ফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি চরম ভুল বলে আখ্যা দেন। উগরা বলেন, 'একদমই ভুল। কোনো সন্দেহ নেই। এই বছরে কেবল একজন বাংলাদেশি আইপিএলে খেলত—সে মাত্র চুক্তি করেছিল। তাকে বাদ দেওয়ার মানে হচ্ছে দুর্বলদের ওপর নিজের শক্তি দেখানো। একজন ক্রিকেট সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, এটা খুব বাজে একটি সিদ্ধান্ত।'

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথাও উল্লেখ করেন উগরা। তার মতে, 'এই সিদ্ধান্ত বিসিসিআই থেকে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন খুব ভালো নয়। আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে নির্বাচন সামনে। বিসিসিআই এই নির্দেশ না দিলে হয়তো মোস্তাফিজ কেকেআরের হয়ে আইপিএল খেলতে পারত। এটা ক্রিকেটীয় নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।'

বাংলাদেশের ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় সরানোর সুযোগ থাকলেও তা না করাকে বিসিসিআইয়ের ‘ইগো’ বলেও উল্লেখ করেন উগরা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যদি শ্রীলঙ্কায় খেলত, কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু তাতে বিসিসিআইয়ের ইগোতে লাগত। আইসিসির প্রেসিডেন্ট না হলে হয়তো ফল ভিন্ন হতে পারত।”

আইসিসিতে ভারতের প্রভাব প্রসঙ্গে উগ্রার মন্তব্য আরও সরাসরি—“এখন সবাই জানে, আইসিসি আসলে বিসিসিআইয়ের দুবাই অফিস। যেভাবে বিসিসিআই চায়, সেভাবেই আইসিসি চলে। এই সিদ্ধান্তে আমি একদমই অবাক হইনি।”

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিকল্প ভেন্যু না দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে উগরা বলেন, “কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বে তেমন প্রভাব নেই। আইসিসির বোর্ডে বাংলাদেশের বন্ধু কম। প্রায় ২০ কোটির বেশি মানুষের দেশ এবং বিপুল প্যাশোনেট দর্শক থাকা সত্ত্বেও খুব সহজেই তাদের বাদ দেওয়া হলো। ভারত যদি বলত পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশে খেলতে চায় না—আইসিসি নিশ্চিত বিকল্প ব্যবস্থা নিত।”

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।