একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কখন স্বাধীন হয়? এককথায় বলা যায়, যখন সেই দেশ জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের মাধ্যমে শাসিত হয়। একই সঙ্গে দেশটি অবশ্যই অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হতে হবে। মনে রাখা দরকার, কোনো দেশ এমনি এমনি আরেকটি দেশকে, অর্থ-অস্ত্র বা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে কাছে টানে না। সেখানে সুপ্ত থাকে গভীর আকাক্সক্ষা। যার মাধ্যমে সেই দেশটি তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। যেকোনো বিচারেই তা শতভাগ রাজনৈতিক। যে কারণে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতিতে চিরস্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু দেশ নেই। সবকিছু নির্ভর করে চলমান অভ্যন্তরীণ এবং বৈশি^ক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়। মূলত জাতীয় ঐকমত্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করলে পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী হতে বাধ্য। মোদ্দাকথা, একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী হলে পররাষ্ট্রনীতি আপনাতেই শক্তিশালী হয়।
বারবার বলা হচ্ছে, জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির মূল চাবিকাঠি। জনভিত্তির ওপর নির্ভর করে দৃঢ় হয় জাতীয় ঐক্য। মনে রাখা দরকার, জনরায় ছাড়া জনভিত্তি আসে না। আবার জনরায় পেতে দরকার, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন। যার মাধ্যমে দেশের মানুষ তাদের চিন্তা ও বিশ্বাস অর্পণ করেন দলীয় প্রতিনিধির ওপর। যে কারণে বলা হচ্ছে ‘শক্ত পররাষ্ট্রনীতির জন্য চাই জনভিত্তি’। মঙ্গলবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক নীতি-সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক নীতি সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন একটি চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’ অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সামান্তা শারমিন বেশ কৌশলী কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন ‘বাংলাদেশে নৈতিকতার ওপর ক্ষমতার প্রাধান্য থাকে। এ কারণে অভ্যন্তরীণ নীতি ঠিক না থাকলে, বহির্বিশ্বের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক থাকবে না।’ আমাদের দেশকে উন্নয়নের জন্য বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হয়। শ্রদ্ধা ও সম্মান তখনই বাড়ে, যখন একটি দেশ সব দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হয়। এটা জগতের নিয়ম। দুর্বলকে কেউ হিসাবে রাখে না।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জনগণের ঐক্য ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, আমাদের নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসকে আন্তর্জাতিক পরিসরে শতভাগ তুলে ধরতে পারছি না। এর মূল কারণ, আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য আসেনি। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড শতাব্দীর পর শতাব্দী যুদ্ধ করেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা এক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমা ফেলেছিল। কিন্তু এখন সে জাপানকে শক্তিশালী মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর মূল কারণ কী, আমরা জানি। প্রকৃত অর্থে, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে আমাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন আপনাতেই অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সামরিক শক্তিতে নিজ দেশকে উন্নত করতে পারলে, উপযুক্ত সম্মান এবং ভারসাম্যপূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিজস্ব নিয়মেই তৈরি হবে। এর মানে হচ্ছে, শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য দরকার ‘জনভিত্তি’।