সরকার গঠনের সুযোগ পেলে কর্মজীবী মা দের কর্মঘন্টা কমিয়ে ৫ ঘন্টা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তারা ৫ ঘন্টা কাজ করেই পুরো সময়ের বেতন পাবেন। যা সরকার ব্যবস্থা করবে বলে জানান তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার বনানীর হোটেলে শেরাটনে জামায়াত আয়োজিত 'বাংলাদেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন বা 'দ্যা প্রোসপারিটি ডায়ালগ, স্ট্র্যাটেজিক থটস ফর ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেড অফ বাংলাদেশ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বারবিডার সভাপতি আব্দুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসন এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কর্মকর্তারা সহায়ক নয় বরং নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। এই মানসিকতার আমূল পরিবর্তন জরুরি। শিল্প ও বিনিয়োগ উন্নয়নে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মডেল অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি। সরকারকে প্লট-ফ্ল্যাট ব্যবসা না করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্প ভাড়ার আবাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং ঢাকার জন্য আলাদা আরবান গভর্নমেন্ট গঠন প্রয়োজন।
আদ দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. শেখ মহিউদ্দিন বলেন, কর্মজীবী নারীদের জন্য দৈনিক কাজের সময় ৪–৫ ঘণ্টা করার প্রস্তাব দেন, যাতে তাঁরা পরিবার, মাতৃত্ব ও পেশাগত দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে পারেন। তাঁর মতে, যে জাতি মাতৃত্বকে সম্মান করতে পারে না, তারা উন্নতি করতে পারে না। ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক দল নেই, তারা শুধু নিরাপদ ব্যবসা পরিবেশ চায়। তিনি বিলাসিতা ও অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতা সমালোচনা করে নৈতিকতা ও ধর্মীয় আদর্শে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানান।
এমসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, গত চার দশক ধরে তিনি আইটি খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং ১৯৯৮ সালে বেসিস গঠনের উদ্দেশ্য ছিল এ খাতকে এগিয়ে নেওয়া। আগামী ১০–২০ বছরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি অর্থনীতিকে নতুন রূপ দেবে এবং মানুষের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। আইটি আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ ভারত ও ফিলিপিন্সের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও এই খাতে এখনও বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, একটি এলপিজি নীতিমালার অনুমোদনের জন্য তাঁকে বহুবার সচিবালয়ে যেতে হয়েছে, যা প্রশাসনিক জটিলতার উদাহরণ। কর্মকর্তারা নিজেদের রাজা এবং ব্যবসায়ীদের প্রজা মনে করেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। এসিল্যান্ড পদে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তা বাতিলের প্রস্তাব দেন। সব দপ্তরে অটোমেশন চালু ও বারবার এসআরও পরিবর্তন বন্ধের দাবি জানান। তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল- আলম চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়ীরা সমাজে সম্মান ও স্বাধীনতা চান এবং রাজনৈতিক কারণে তাদের হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের ১৮ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গার্মেন্টস খাত প্রযুক্তিনির্ভর হলেও অটোমেশনের ফলে নতুন চাকরি কমছে। ভবিষ্যতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোবাইল, আইটি ও হালাল পণ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীদের জনগণের শত্রু নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালা প্রণয়নে ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা প্রয়োজন। ওষুধ শিল্পে ব্যবসা করতে ৪৭টি লাইসেন্স ও নিয়মিত নবায়ন বড় বাধা। আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও হয়রানির কারণে উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি ওয়ান স্টপ সার্ভিস, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জোর দাবি জানান।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করা সম্ভব। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের কারণে বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছে না। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা জরুরি। গ্যাস সংকটে অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ভারতের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সেখানে বিনিয়োগে বড় অঙ্কের প্রণোদনা দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশেও চালু করা প্রয়োজন।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক আরেক সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য খুবই কম, যা বাড়ানো জরুরি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীদের বিকল্প জ্বালানিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়, ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের দক্ষতা এখনো চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় কম। মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তুললে দেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার আরও কার্যকর হবে।