ময়মনসিংহে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি যখন প্রার্থী, প্রতীক ও ভোটের হিসাব-নিকাশে তৎপর, তখন এক মানবিক পরিবর্তন নীরবে কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঘটতে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে এবার হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) পরিচয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ৪১ জন ভোটার।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহে মোট ভোটার ৪৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৪ লাখ ৬ হাজার ৮৯২ জন, নারী ভোটার ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৬৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ৪১ জন।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটকেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সেতু বন্ধন হিজড়া কল্যাণ সংঘের সভাপতি জয়িতা তনু হিজড়া বলেন, অতীতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে হিজড়াদের পুরুষ পরিচয়ে ভোট দিতে বাধ্য হতে হয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা নিজস্ব হিজড়া পরিচয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের জন্য আনন্দ ও আত্মমর্যাদার বিষয়।
তিনি বলেন, আমরা নারীদের মতো পোশাক পরি, জীবনযাপন করি ভিন্ন বাস্তবতায়, অথচ ভোট দিতে হতো পুরুষের নামে। এতে কখনো সত্যিকারের আনন্দ অনুভব করতাম না। এবার প্রথমবার নিজস্ব পরিচয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। এটি আমাদের জন্য শুধু ভোট নয়, বরং পরিচয়ের স্বীকৃতি।
জয়িতা তনু জানান, জেলায় আত্মপরিচয়ে বা গোপনে বসবাসকারী কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক হিজড়া রয়েছেন। অথচ ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছেন মাত্র ৪১ জন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রে লিঙ্গ সংশোধনের জটিলতা এবং অতীতে পরিচয়পত্র তৈরির সময় তৃতীয় লিঙ্গের কোনো অপশন না থাকাকে দায়ী করেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের অনেক হিজড়া রয়েছেন, যারা শুধুমাত্র পুরুষদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে এই ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যান না। জাতীয় পরিচয়পত্রে লিঙ্গ পরিবর্তনের জটিলতার কারণে অনেকেই হিজড়া হওয়া সত্ত্বেও এখনও পুরুষ পরিচয়ে নিবন্ধিত রয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, আগে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় তৃতীয় লিঙ্গের কোনো সুযোগ ছিল না। সে কারণে বাধ্য হয়েই হিজড়াদের পুরুষ পরিচয়ে পরিচয়পত্র করতে হয়েছিল।
জয়িতা তনুর মতে, হিজড়া পরিচয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জজ কোর্টের শেখ আবু সাদাত মুহাম্মদ খায়ের বলেন, হিজড়া পরিচয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া আমাদের সংবিধান ও মানবিক মূল্যবোধের একটি বড় অগ্রগতি। জেলায় ৪১ জন হিজড়া ভোটার নিজস্ব পরিচয়ে ভোট দিতে পারা তাদের নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি। এতে গণতন্ত্র আরও সবার জন্য উন্মুক্ত হলো।
উল্লেখ্য, ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে ৬৭ জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।