ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মাত্র দশ দিনের দূরে অবস্থান করলেও দেশের অধিকাংশ হেভিওয়েট দল নিজেদের ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। ভোটারদের মাঝে দলীয় প্রার্থীরা প্রচারণা চালানোর সময় যে আশ্বাস দিচ্ছেন, সেটিই তাদের দলের ইশতেহার বলে ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই সাধারণ ভোটারদের। তবে কেউই পিছিয়ে নেই তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের। তরুণদের সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইন মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন জরিপে মতামত আহ্বান করা প্রভৃতি কাজে পিছিয়ে নেই কোনো দলই। তাদের ইশতেহারে যেন তরুণদের মতামত প্রতিফলিত হয় সেদিকে নজর রয়েছে সব দলের। কারণ নিশ্চিতভাবেই এবারের নির্বাচনের শেষ হাসি হাসবে সেই দল বা জোট, যাদের প্রতি সমর্থন থাকবে তরুণ ভোটারদের।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুয়ায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি, যা মোট ভোটার সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার চান ইতিবাচক পরিবর্তন। তারা নিজেদের শিক্ষার পরিবেশ ও কর্মসংস্থান নিয়ে চিন্তিত। যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল তার প্রতিফলন তারা দেখতে চান নির্বাচিত সরকারের কর্মসূচিতে ও কাজে। সেজন্য তারা দলগুলোর ইশতেহারের ওপর নজর রাখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাত নিপু জানান, যারা জনজীবনে নিরাপত্তা, বেকারত্ব হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমি এই নির্বাচনে তাদেরই সমর্থন করব। নিপুর মতো তরুণ ভোটারের চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই তরুণ বান্ধব কর্মসূচি দিয়ে দলগুলো সাজিয়েছে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।
গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে পরিচিত মুখ নাহিদ ইসলামের আহ্বানে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি এবারের নির্বাচনে শাপলা কলি নিয়ে ভোটের মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের শরিক দল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদের একটি প্ল্যাটফরম বলে স্বাভাবিকভাবেই তরুণদের প্রত্যাশা তাদের কাছে অনেক বেশি। দলটি তাদের ইশতেহারে সেই প্রতিফলন রাখার চেষ্টা করেছে। ৩৬ জুলাইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা ৩৬ দফা ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে ছয়টিই শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তাদের পরিকল্পনা ব্যক্ত করছে। শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য তারা শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যা বিদ্যমান শিক্ষা মাধ্যমগুলোর মধ্যে একটি যৌক্তিক সমন্বয় করবে। উচ্চশিক্ষাতেও গুণগত পরিবর্তন আনার জন্য রয়েছে তাদের প্রস্তাবনা। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১ কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তাদের। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে সবাই যে শহরে বাস করে বা শিক্ষিত তা নয়। তাদের কথা মাথায় রেখে দলটি ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টা নির্ধারণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বেকার সমস্যা সমাধানে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি হলো, প্রতি বছর ১৫ লাখ দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা ও যুব-উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন।
তরুণদের চাওয়াকে বুঝতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আয়োজন করছে সরাসরি মতবিনিময় সভা ও অনলাইনে অয়েবিনার। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তরুণ অ্যাক্টিভিস্টরা। এখনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ না করলেও বিএনপি জনসভায় প্রকাশ করেছে তরুণদের জন্য তাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা। সরকার গঠন করলে তারা ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা প্রদানের আশ্বাস জানিয়েছেন। তরুণ উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সহায়তার জন্য তারা আইটি পার্ককেও উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দক্ষ ও যোগ্য তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা হতে সহায়তা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয়ের পথে বাধা দূর করার নানা কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে জামায়াত সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেলের জয়ের কারণে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে তারাও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার দৌড়ে পিছিয়ে থাকতে চায় না। তরুণদের জন্য দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান তৈরির বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ গঠন, জেলা পর্যায়ে জব ইয়ুথ ব্যাংক গঠন, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার ক্যারিয়ার গড়তে সহায়তা করা এবং দক্ষতা অর্জনে নানা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
মোট ভোটের এক-তৃতীয়াংশ হিসেবে তরুণ ভোটারই এবারের নির্বাচনের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এই জনসংখ্যার বিরাট একটি অংশ দীর্ঘদিন ভোট দেননি। একটি পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা তাদের মানসপটে খোদিত। দলগুলোর প্রতিশ্রুতি দেখে তারা আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করছেন কারা তাদের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে তারা বিবেচনায় নেবেন দলগুলো ট্র্যাক রেকর্ড ও প্রতিশ্রুতি পূরণের কর্মপরিকল্পনা। পরিবর্তন আকাক্সিক্ষ এই তরুণ ভোটারদের মন জয় করাই এবারের নির্বাচনে রাজনীতিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।