ভোটের গান

দেখতে দেখতে সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন গরম হচ্ছে নির্বাচনী মাঠ, সরব হচ্ছে চায়ের আড্ডা। সঙ্গে বাড়তি উন্মাদনা জোগাচ্ছে নানান রঙের, নানা ঢংয়ের নির্বাচনী গান নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো। লিখেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

এক সময় নির্বাচন দেখা যেত প্রার্থীকে সঙ্গে নিয়ে কিংবা সম্মিলিতভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের বলা হতো ভাই, ভোটটা দিয়েন। এখন শোনা যাচ্ছে, ভাই রিলটা শেয়ার করেন। উঠান বৈঠকের জায়গা দখল করেছে রিং লাইট আর পোস্টারের বদলে এসেছে ফিল্টার আর স্লো-মোশন ভিডিও। চমকপ্রদ ছন্দ, সুর আর লিরিকের থিম সং-এ ভোটারদের এখন আকৃষ্ট করতে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো। প্রথাগত মাইকিং আর পোস্টারিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলার চিরায়ত সৌন্দর্য আর সংস্কৃতির দৃশ্যায়নের পাশাপাশি দলগুলো এখন বেছে নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে। এরই মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে থিম সং প্রকাশ করেছে। যা প্রকাশের পর পরই হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের মুখে মুখে। শুধু কী তাই! প্রতিটি বিভাগীয় শহরগুলোর পাশাপাশি জেলা, থানা এমনকি প্রার্থীদের নিয়েও তৈরি করা হয়েছে আলাদা আলাদা গান। নির্দিষ্ট আসনের ভোটারদের টার্গেট করে ফেসবুক ও ইউটিউবে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিসহ প্রচার চালানো হচ্ছে। আর এসব গান ও এর ভিডিওগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ইউটিউড, টিকটিকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায়। টিভি চ্যানেলগুলোতেও দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের নির্বাচনী গান। বিটিভিসহ দেশের অনেক বেসরকারি টিভি স্টেশনও অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে এসব গানচিত্র প্রচার করছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় ডিজিটাল মিডিয়াই যেন গুরুত্বপূর্ণ ও বড় এক একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছ। দলীয় থিম সং, স্বল্পদৈর্ঘ্যরে ভিডিও এমনকি প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়া প্যারোডি গানও শোভা পাচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্মে।  বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ আরও ছোট কিছু দল তাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠনের ব্যানারে বানিয়েছে এ রকম অন্তত ডজনখানেক গান। বিএনপির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করেছে তাদের অফিসিয়াল থিম সং ‘ভোট দেবেন কিসে, ধানের শীষে’। গানটিতে ব্যবহার করা হয়েছে, ‘আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেøাগান। আবহমান বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ফুটে উঠেছে এর প্রতিটি সুরে। একই সঙ্গে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি নেতাদের মতে, এই গানের মাধ্যমে দলের রাজনৈতিক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে আরও প্রাণবন্তভাবে পৌঁছে যাবে। ইউটিউব ও ফেসবুকে গানটি প্রকাশের পর থেকেই তা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আতিয়া আনিসা ও নিলয়। কথা ও সুর করেছেন তানভীর চৌধুরী।

অন্যদিকে ভিন্নধর্মী এক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী থিম সং উদ্বোধন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর শাহবাগে মাদুর পেতে বসে দলের নেতাকর্মীরা সুরে সুরে প্রকাশ করেন তাদের গান, ‘ভোটের মিছিলে আমার প্রতীক শাপলা কলি’। এই থিম সংয়ে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, তরুণদের যাপিত জীবন এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা ও ভিডিও গুরুত্ব পেয়েছে। এনসিপি নেতাদের দাবি, সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবিই তাদের প্রচারণার মূল হাতিয়ার। পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীও। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু প্রকাশ করা হইনি তবে দলটির সমর্থক-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি থিম সং প্রচার করেছেন। এর মধ্যে ‘নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল দেখা শেষ, দাঁড়িপাল্লা এবার গড়বে বাংলাদেশ’ গানটি বেশি জমে উঠেছে। 

প্রযুক্তির এই নতুন জোয়ারে অংশ নিয়েছে নির্বাচন কমিশনও। ভোটারদের পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রচার করা হচ্ছে বিশেষ সচেতনতামূলক থিম সং, যেখানে ‘হ্যাঁ’এবং ‘না’ ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ বার্তা। ভোটের প্রচারণার এই অভিনব প্রচারণা নিয়ে ডিজিটাল মার্কেটিং বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে তৈরি ভিডিওগুলোতে আবেগ, ট্রেন্ডিং মিউজিক ও নাটকীয় উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক দলের প্রচারণাতেও তরুণদের আকৃষ্ট করতে ট্রেন্ডিং মিউজিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব নির্বাচনীয় গানের সঙ্গে নাচ বা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিসহ তৈরি হচ্ছে টিকটক ভিডিও। মুহূর্তে তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মার্কেটে গিয়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানার,  ফেসবুক খুললেই নির্বাচনীয় গান আর প্রচার সামনে আসে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে এসব প্রচার চালানো হয়। এমনটা করবে না কেন? আজ সবার হাতে স্মার্টফোন আছে। ফেসবুক-ইউটিউব চালায়। চোখের সামনে বারবার একজন প্রার্থীর প্রচার ভেসে এলে তার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তরুণ ভোটাররা। টিকটক, রিলস ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে তরুণদের উপস্থিতি বেশি হওয়ায় দলগুলো সেখানেই সর্বাধিক বিনিয়োগ করছে। সহজ ভাষা, স্লোগানধর্মী বার্তা ও আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল দিয়ে তরুণদের আবেগে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঢাবির কয়েকজন শিক্ষার্থীরা বললেন, রাজনীতি ছিল আগে হাটে-মাঠে-ঘাটে। গ্রামের বাড়িতে প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পে চায়ের কাপে জমে উঠত রাজনীতি। এখন রাজনীতি নিউজফিডেই বেশি দেখি। কে কী বলছে, সেটা অনেক সময় যাচাই করার সুযোগ পর্যন্ত থাকছে না।