জাতীয় নির্বাচন শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি বরাবরই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির সংযোগবিন্দু। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে- যখন বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন সক্রিয়। প্রশ্ন শুধু নির্বাচনে কে জিতবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো যারা জিতবে, তারা কতটা স্বাধীনভাবে দেশ চালাতে পারবে? ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ সমস্ত শক্তি নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় কোন ধরনের ভূমিকা নেবে? সহযোগিতা, চাপ নাকি অসহযোগিতা? দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকার গঠনের ধরন এবং পররাষ্ট্রনীতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটের অংশ। এই অঞ্চল এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ফলে বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় এলো, তারা কোন পররাষ্ট্র কৌশল গ্রহণ করল তা কেবল ঢাকার বিষয় নয়। বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প, রপ্তানি বাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি শক্তিগুলো জানে, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা প্রশ্নবিদ্ধ সরকার থাকলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানো সহজ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দিল্লি, আমাদের রাজনীতিকে কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিষয় হিসেবে দেখেনি। বরং একে নিজস্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভারত আগের অবস্থানে নেই। এর কারণ বহুমাত্রিক। প্রথমত, আন্তর্জাতিক নজরদারি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সক্রিয়তা ভারতের একক প্রভাবের জায়গা সংকুচিত করেছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করলে সেটি উল্টো জনমনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে যা দিল্লি এড়াতে চায়। তৃতীয়ত, চীনের উপস্থিতি। বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ভারতের কৌশলগত হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ভারত এখন নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে দ্রুত কার্যকর সম্পর্ক গড়ার কৌশলে মনোযোগী। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এই নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট ও নীতিগত। ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগ কে ক্ষমতায় এলো, তার চেয়েও বেশি কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এলো। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। তবে তারা সরাসরি সরকার পরিবর্তনের পথে হাঁটছে না। বরং নির্বাচনের অংশগ্রহণ, সহিংসতা, বিরোধীদের সুযোগ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এই বিষয়গুলোকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল দ্বিমুখী। একদিকে, তারা প্রকাশ্যে বলছে বাংলাদেশের জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে, তারা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে কূটনৈতিক ও নীতিগত প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের ভূমিকা অনেক সময় চোখে পড়ে না, কিন্তু বাস্তবে তা গভীর। তারা সাধারণত উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক বিবৃতির বদলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের মাধ্যমে কাজ করে। ইইউর পর্যবেক্ষক দল, নির্বাচন-পরবর্তী রিপোর্ট এবং মানবাধিকার মূল্যায়ন এই তিনটি বিষয় দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি ইউরোপীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, ইইউর অবস্থান রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটে- কম কথা, বেশি কৌশল। যদি নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে তারা যে সরকারই গঠন করুক, বাস্তববাদী সম্পর্ক বজায় রাখবে। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হলে, নীরব অসহযোগিতার পথ খোলা থাকবে। চীন প্রকাশ্যে বলে বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই বক্তব্য নীতিগতভাবে সত্য, কিন্তু বাস্তবতা জটিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কতটা শক্তিশালী? শক্তি বলতে যদি কেবল সংসদে আসনসংখ্যা বোঝানো হয়, তবে সেটি একটি বড় ভুল বিশ্লেষণ। নতুন সরকারের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করবে মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আস্থা। এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া কেবল সংসদীয় সংখ্যা কোনো সরকারকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করতে পারে না। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিরোধীরা সংসদে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তবে রাজনৈতিক বিরোধ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি তারা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বা সংসদ বর্জন করে, তাহলে রাজনীতি চলে যায় রাজপথে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন-পরবর্তী অসহযোগিতা প্রায় একটি চেনা অধ্যায়। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে বা বিরোধীরা ফলাফল মেনে না নিলে, শুরু হয় বহুমাত্রিক চাপের রাজনীতি। এই অসহযোগিতা কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না। কূটনৈতিক লবিং, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনে অভিযোগ, বিদেশি গণমাধ্যমে ন্যারেটিভ তৈরি এসব একসঙ্গে চলতে থাকে। লক্ষ্য একটাই সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখা। এ ধরনের ষড়যন্ত্র সবসময় দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এটি ধীরে কার্যকর হয়।
বিদেশি শক্তির হাতে সবচেয়ে কার্যকর চাপের অস্ত্র হলো, অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রপ্তানি, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যদি আন্তর্জাতিক আস্থা হারায়, তাহলে এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি বাজারে। অনেক সময় সরকার রাজনৈতিকভাবে শক্ত থাকলেও অর্থনৈতিক চাপে আপস করতে বাধ্য হয়। এই কারণে অর্থনীতি হয়ে ওঠে বিদেশি প্রভাবের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র। ভারত ঐতিহাসিকভাবে এমন সরকারকেই স্বস্তিতে গ্রহণ করে, যারা বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতামূলক ভূমিকা নেয়। এই বাস্তবতায়, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, ভারত তার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত থাকবে যদি তারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে ন্যারেটিভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সহিংসতা, বর্জন, মানবাধিকার অভিযোগ এসব শিরোনাম হয়ে উঠলে সরকারের পক্ষে কূটনৈতিকভাবে অবস্থান ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়। এই ন্যারেটিভ একবার তৈরি হয়ে গেলে, সেটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার ও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। ফলে মিডিয়া ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু ইমেজের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের পরীক্ষা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ কি প্রমাণ করতে পারবে, সে নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম? নাকি আবারও প্রমাণ হবে দেশটি বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ঘুঁটি? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে ভোটের ফল ঘোষণায় নয়, বরং নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনে।
লেখক: সমাজ গবেষক ও কলাম লেখক
columnistforum2023@gmail.com