খুলনায় গৃহহীন ১৪৫ পরিবার

পঞ্চান্ন বছরের ময়না বেগম পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে তীব্র শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। শুধু ময়না বেগমের পরিবার নয়, ঘরবাড়ি হারিয়ে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের গরুর হাট ও বিভিন্ন জায়গায় খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে ১৪৫টি পরিবার। বুড়িভদ্রা নদী খননে গৃহহীন হয়ে পড়েছে চুকনগর আবাসনের প্রায় ৮০০ মানুষ। এ ছাড়া গৃহহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও ৫৩টি পরিবার। একদিকে ভোটের উৎসব, অন্যদিকে গরিবের কান্না দেখার কেউ নেই।

পাউবো সূত্র জানায়, খুলনা ও যশোরের ১৪০ কোটি টাকায় ৩টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। নদী তিনটি হচ্ছে, টেকা, হরি, তেলিগাতী, গ্যাংরাইল নদী মিলিয়ে একটি, হরিহর ও আপার ভদ্রা নদী মিলিয়ে একটি ও শ্রীনদী। নদী তিনটি খননে তত্ত্বাবধান করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনটি নদীর মধ্যে বুড়িভদ্রা নদীর চরে চুকনগর অংশে ১৪৫টি ও কাঠালতলা অংশে ১০৫টি আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণ করে সরকার। সম্প্রতি বুড়িভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর আশ্রয়ণের ১৪৫টি ঘর উচ্ছেদ করা হয়েছে। ফলে ঘরবাড়ি হারিয়ে হতদরিদ্র ৮০০ মানুষ চুকনগর বাজারের গরুর হাট ও বিভিন্ন জায়গায় খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। তীব্র শীতের মধ্যে এসব মানুষ জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১০৫টি ঘরের মধ্যে ৫৩টি ঘর উচ্ছেদের খবরে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী শিরিনা বেগম বলেন, ‘সরকার দুই শতক জমি আমার নামে রেজিস্ট্রি করে দলিল সরবরাহ করে। সেই পর্যন্ত আমি পরিবারের আটজন সদস্য নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করে আসছি। এখন আমার পরিবারে ২৪ দিন বয়সের একটি শিশু রয়েছে। হঠাৎ আমাদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করায় শিশু বাচ্চাকে নিয়ে আমরা চরম বিপদে পড়েছি। শীতের মধ্যে এখন খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য হচ্ছি।’

ফারুক জোয়ার্দার নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘শিশু বাচ্চাসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে গত এক সপ্তাহ খোলা আকাশের নিচে আছি। তীব্র এই শীতের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছি।’

হামিদা বেগম নামের অন্য আরেকজন নারী বলেন, ‘ঘরবাড়ি উচ্ছেদের পর থেকে রান্নাবান্না বন্ধ। শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছি।’

কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের হামিদ শেখ হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘সারাদিন ইটভাটায় কাজ করে রাতে ঘরে এসে ঘুমাই। এখন আশঙ্কায় আছি নদী খননের নামে কখন ঘর ভেঙে দেয়। আমরা খাবার চাই না, আমরা চাই মাথা গোঁজার ঠাঁই।’

ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর চুকনগর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলাউদ্দীন মাঝি বলেন, সরকার বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করে; কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে নদীর মাঝে ঘর নির্মাণ করায় কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে শত শত মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হেলালউদ্দীন জানান, প্রায় ৮০০ মানুষ এক সপ্তাহ ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের এই দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, জেলা প্রশাসক অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করলে পাশর্^বর্তী সরকারি খাল ভরাট করে গৃহহারা মানুষদের জায়গা দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বিএম আব্দুল মোমেন জানান, প্রকল্পে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের জন্য কোনো অর্থ ধরা নেই। ফলে প্রকল্পের আওতায় তাদের পুনর্বাসন সম্ভব না।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, ‘সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদী খনন হচ্ছে। আমি যতটুকু জেনেছি, তাদের উচ্ছেদ করা হয়নি। তাদের শুধু চলে যেতে বলা হয়েছে। তারা নিজেরাই ঘর ভেঙে নিয়ে চলে গেছে। তাদের ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’