সম্প্রতি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেলে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একটি পোস্টকে ঘিরে অনেক আলোচনা সমালোচনা ঝড় উঠেছে। তবে ইসলামে নারীর মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ ও সুনির্দিষ্ট। আইয়ামে জাহেলিয় যুগের অন্ধকার দূর করে ইসলামই প্রথম নারীদের সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষা, স্বাধীন মতামত ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করেছে। নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান দায়িত্ব ও প্রতিদানযোগ্য।
নবীজির (সা.) যুগে পুরুষ সাহাবীদের মত নারী সাহাবিরাও নবীজির (সা.) সঙ্গে যুদ্ধে যেতেন। তারা আহতদের চিকিৎসা করতেন, অসুস্থদের সেবা, সৈনিকদের পানি পান করাতেন। কখনও কখনও প্রয়োজনে সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
উহুদের প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) বলেছেন, উহুদের যুদ্ধে আমার ডানে-বামে আঘাতগুলো ঢাল দিয়ে তিনি প্রতিহত করলেন। তারপর তিনি তরবারির আঘাত করে শত্রু সৈন্যের ঘোড়ার পা কেটে ফেললেন। ঘোড়া মাটিতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত্রু সৈন্যও মাটিতে পড়ে গেল। হুজুরে আকরাম (সা.) এ দৃশ্য দেখে হজরত উম্মে আম্মারার দুই সন্তানকে তাদের মাকে সাহায্য করেতে পাঠালেন। তারা অগ্রসর হয়ে শত্রুকে প্রতিহত করলেন।
ওহুদের প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে বেশ কয়েকজন নারীও ছিলেন। তারা সৈন্যদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবাযত্ন করতেন।
উহুদে অংশ নেওয়া হজরত আয়েশা, হজরত আনাসের আম্মা উম্মে সুলাইম, হজরত উম্মে আম্মারা (রা.), আনহুন্না আজমাঈন প্রমুখ নারী মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন।
তারা মশকভর্তি করে পানি এনে সৈন্যদের পান করাতেন এবং পানি শেষ হয়ে গেলে পুনঃ মশক ভর্তি করে পানি নিয়ে আসতেন। আহত সৈন্যদের ক্ষতস্থানে তারা ব্যান্ডেজও বেঁধে দিতেন।
তবে উহুদের যুদ্ধে যত নারীই অংশগ্রহণ করে থাকুন না কেন, হজরত উম্মে আম্মারা (রা.) এর অভাবনীয় ভূমিকার কারণে তার নাম সবচেয়ে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। তীরন্দাজ বাহিনীর আদেশ অবহেলার কারণে মুসলিম বাহিনী যখন হঠাৎ শত্রু বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়ে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে পড়েছিল, তখন হজরত উম্মে আম্মারা আহত সৈন্যদের সেবায় ব্যস্ত ছিলেন।
তিনি যখন শুনলেন শত্রু বাহিনী চিৎকার করে বলছে, ‘কোথায় মুহাম্মদ! তার সন্ধান করতে থাক, সে জীবিত থাকলে আমরা কেউ বিপদমুক্ত নই; তাই তাকে হত্যা করতেই হবে।’
এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত হজরত উম্মে আম্মারা উঠে দাঁড়ালেন এবং দেখলেন আল্লাহর নবী যেখানে অবস্থান করছেন, শত্রু বাহিনী সেদিকেই ছুটি যাচ্ছে। তিনি একজন নারী, তবুও নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। পানির পাত্র সজোরে নিক্ষেপ করলেন। যৎসামান্য যে অস্ত্র হাতের কাছে পেলেন তা নিয়ে শত্রুর সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন। একটি ঢাল জোগাড় করে তিনি শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে লাগলেন। শত্রুর আক্রমণ এতটা তীব্র ছিল যে অনেক বিখ্যাত মুসলিম বীরও ময়দানে টিকে থাকতে পারেননি। অথচ এ ধরনের মারাত্মক ও নাজুক পরিস্থিতিতে হজরত উম্মে আম্মারা (রা.) অতুলনীয় বিক্রমে শত্রু বাহিনীকে প্রতিরোধ করেছিলেন।
তিনি তীব্র বেগে ছুটে একবার ডানে এবং একবার বামে যাচ্ছিলেন, যেন শত্রু বাহিনীর কোনো সদস্য আল্লাহর নবীর কাছে যেতে না পারে। হজরত উম্মে আম্মারার দুটি সন্তানও ওহুদের প্রান্তরে যুদ্ধ করছিলেন। শত্রু বাহিনী যখন দেখল এ নারীর কারণে মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, এই নারীকে আগে হত্যা করে তারপর মুহাম্মদের কাছে অগ্রসর হতে হবে। তখন শত্রু বাহিনী হজরত উম্মে আম্মারাকেই আক্রমণ করল।
একজন সৈন্য তার দিকে অগ্রসর হয়ে তার ওপর তরবারির আঘাত করল। হজরত উম্মে বললেন, ওহে উম্মে আম্মারা! তুমি তোমার সন্তানের ওপর আঘাত করার কারণে উত্তম প্রতিশোধ গ্রহণ করেছ।’ মক্কার কুরাইশদের মধ্যে কামিয়ার সঙ্গেও হজরত উম্মে আম্মারা (রা.) ভয়ঙ্কর মুহূর্তেও যুদ্ধ করছিলেন। ইবনে কামিয়া রাসুলকে হত্যা করার জন্য বারবার আক্রমণ করছিল। এই জালিমও রাসুল (সা.) এর পবিত্র দেহে আঘাত করেছিল। রাসুলের জীবনের এই কঠিন মুহূর্তে হজরত উম্মে আম্মারা (রা.) একজন নারী হয়েও নিজের জীবন বিপন্ন করে ইবনে কামিয়াকে প্রতিরোধ করছিলেন।
আক্রমণকারী জালিমের দেহ ছিল লৌহ বর্মে আবৃত। হজরত উম্মে আম্মারা জালিমকে হত্যা করার জন্য তরবারি দিয়ে আঘাত করেন। কিন্তু জালিমের দেহে বর্ম থাকার কারণে তার তরবারি ভেঙে গেল। জালিম এবার সুযোগ পেয়ে হজরত উম্মে আম্মারাকে আঘাত করতে উদ্যত হয়। হজরত উম্মে আম্মারা ঢাল দিয়ে সে আঘাত প্রতিহত করতে গিয়েও তার কাঁধে মারাত্মকভাবে আঘাত পেলেন। আহত দেহেই তিনি আল্লাহর দুশমনের সঙ্গে লড়াই অব্যাহত রাখলেন। তার মোকাবিলায় টিকতে না পেরে জালিম আবদুল্লাহ ইবনে কামিয়া পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
নবী করিম (সা.) স্বয়ং এই নারীর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আজ উম্মে আম্মারা অনেকের চেয়ে অধিক বীরত্ব প্রদর্শন করেছে।’
উহুদের প্রসঙ্গ উঠলেই নবী করিম (সা.) বলতেন, উহুদের যুদ্ধে আমার ডানে-বামে আঘাতগুলো ঢাল দিয়ে তিনি প্রতিহত করলেন। তারপর তিনি তরবারির আঘাত করে শত্রু সৈন্যের ঘোড়ার পা কেটে ফেললেন। ঘোড়া মাটিতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত্রু সৈন্যও মাটিতে পড়ে গেল। হুজুরে আকরাম (সা.) এ দৃশ্য দেখে হজরত উম্মে আম্মারার দুই সন্তানকে তাদের মায়ের সাহায্যে পাঠালেন। তারা অগ্রসর হয়ে শত্রুদের প্রতিহত করেছিলেন। এক পর্যায়ে তার সন্তান আহত হলে তিনি সন্তানের ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে আদেশ দিলেন, ‘দ্রুত ময়দানে গিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’
নবী করিম (সা.) হজরত উম্মে আম্মারার সাহসিকতা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। যুদ্ধের ময়দানেই বারবার মহান আল্লাহর কাছে এ নারীর জন্য দোয়া করেছিলেন।
তিনি অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামকে শুনিয়ে হজরত উম্মে আম্মারার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘তার মতো সাহস আর কার আছে।’
লড়াই চলতে থাকল, হজরত উম্মে আম্মারার কাছে এলো ওই ব্যক্তি, যে তার সন্তানকে আঘাত করেছিল। তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে শত্রুর দিকে অগ্রসর হলেন। বিশ্বনবী (সা.) তাকে সতর্ক করে বললেন, উম্মে আম্মারা ! সতর্ক হও! এই জালিম তোমার সন্তান আবদুল্লাহকে আহত করেছে।’
আল্লাহর নবীর কথা শুনে হজরত উম্মে আম্মারার শরীরে যেন সিংহীর শক্তি এসে জমা হলো। তিনি তরবারি দিয়ে পুত্রের ওপর আঘাতকারীর ওপর এমন শক্তিতে আঘাত হানলেন যে তার আঘাতে শত্রু সৈন্য দ্বিখণ্ডিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আল্লাহর নবী এই দৃশ্য দেখলেন। একজন নারীর বীরত্ব দেখে আনন্দে হেসে উঠে বললেন, ‘যেদিকে তাকিয়েছি, সেদিকেই উম্মে আম্মারাকে যুদ্ধ করতে দেখেছি।’
যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, হজরত উম্মে আম্মারার শরীরে ইসলামের শত্রুরা ১২টি স্থানে আঘাত করেছে। এত আঘাত লাগার পরও তিনি যুদ্ধ থেকে বিরত হননি। আল্লাহর রাসুলকে অক্ষত রাখার জন্য তিনি নিজের প্রাণের কোনো পরোয়া করেননি।
এছাড়া উম্মে আম্মারার অন্যান্য যুদ্ধেও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি নজিরবিহীন সাহসিকতার প্রমাণ রাখেন। এই যুদ্ধে তার হাতে গুরুতর আঘাত পাওয়ার আগ পর্যন্ত বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন।