শেষ মুহূর্তে জোরালো প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা

নেত্রকোনার পাঁচটি আসন দখলে রাখতে মরিয়া বিএনপি, গলার কাঁটা জামায়াত

পাহাড়, সীমান্ত আর হাওরের জেলা নেত্রকোনা। এ জেলার দশটি উপজেলাকে ভাগ করা হয়েছে পাঁচটি সংসদীয় আসনে। আর এই সংসদীয় আসনগুলোতে নির্বাচনী প্রচারণায় সরব বিএনপি, জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলো।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আসনগুলো নিজেদের দখলে রাখার চেষ্টা করছে দলগুলো। তবে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে কোণঠাসা বৈঠক কিংবা জনসভা—সব জায়গায় এখন একেক দল অন্য দলের সমালোচনাকে নির্বাচনের অন্যতম বড় হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।

তবে পাঁচটি সংসদীয় আসন বিএনপি ধরে রাখতে চাইলেও এখন তাদের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ জামায়াত কিংবা ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শুরুতে কিছুটা নীরব থাকলেও শেষ মুহূর্তে প্রত্যেকটি আসনে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াত ও জোটের দলগুলো। যা এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপির জন্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচটি আসনের মধ্যে দুই-একটি আসন হারাতে পারে বিএনপি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল আর নির্বাচনের আগে অসংখ্য নেতাকর্মীকে বহিষ্কারকেই দেখছেন অনেকে।

তবে পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে নেত্রকোনা-৪ (মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী) আসনের বিএনপির প্রার্থী লুৎফুজ্জামান বাবর। এছাড়াও জনপ্রিয়তায় নিজের জয় নিশ্চিতে ব্যস্ত বিএনপির আরেক হেভি-ওয়েট ও নেত্রকোনা-১ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আর বাকিগুলোতে বিএনপির প্রার্থীদের সাথে সমান তালে পাল্লা দিচ্ছে জামায়াত ও জোটের প্রার্থীরা।

সমীকরণ আর হিসাব-নিকাশ বলছে, সীমান্ত আর পাহাড় বিস্তৃত নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা)। পাহাড়ি দুই উপজেলায় বাঙালিদের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। সীমান্তবর্তী আসনে ভোটারদের নানা দাবি থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়েছে সীমিত। রয়েছে পানি, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানা সংকট। এছাড়াও এই আসন চোরাকারবারি আর মাদকের ভয়াবহতা গ্রাস করেছে পুরো জেলাকে। তবে সব সংকটের সমাধানসহ প্রার্থীদের সকল প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এই আসনের বিএনপির প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রতিদিনই শহর থেকে গ্রাম কিংবা সীমান্তের শেষ প্রান্তেও মানুষদের দ্বারে দ্বারে ভোটের প্রত্যাশায় ছুটছেন তিনি। দিচ্ছেন সম্ভাবনার নানা প্রতিশ্রুতি।

তবে তার পাশাপাশি আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন এ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গোলাম রব্বানী। একসময় বেশ জনপ্রিয়তা থাকলেও বারবার দল পরিবর্তনে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ তিনি। তবে এবারের নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি। খেলাফত মজলিসের ‘রিকশাথ প্রতীক নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। অনেকে বলছেন, এই আসনে তার অবস্থানও শক্তপোক্ত। এ ছাড়া এ আসনে প্রার্থিতায় নাম লিখিয়েছেন জাতীয় পার্টির মো. আনোয়ার হোসেন খান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. আলকাছ উদ্দিন মীর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আব্দুল মান্নান সোহাগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) মো. বেলাল হোসেন।

জেলার সদর দপ্তর কিংবা প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটার রয়েছে এখানে। ভোটের দিক দিয়েও হিন্দু-মুসলিম প্রায় সমান সমান। বারবার আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এই আসনটি বিএনপির দখলে নিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিএনপির জেলা কমিটির সভাপতি ও বিএনপির প্রার্থী ডা. আনোয়ারুল হক। শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বিএনপির জন্য সবচেয়ে সহজ নির্বাচন হচ্ছে এ আসনে বলে মনে করছেন অনেকেই। তাই নিশ্চিত জয় ভেবে প্রচার-প্রচারণায় অনেকটা ঢিলেঢালা অবস্থানে নেতাকর্মীরা।

তবে এই অবস্থা পুঁজি করে নিয়েছে অন্যান্য প্রার্থীরা। এই আসনে বিএনপির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা ১১ দলীয় জোটের পক্ষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান (শাপলা কলি প্রতীক), ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ভোটারদের মাঝে আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়াও রয়েছে জাতীয় পার্টির এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার। আর শেষ মুহূর্তে এসে খেলাফত আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব গাজী আব্দুর রহীম রুহী বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।

শিল্প-সাহিত্যের আঁতুড়ঘরখ্যাত হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসন। নেত্রকোনার সব কয়টি আসনের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ কিংবা সহিংসতা সবকিছুতেই আলোচনায় নেত্রকোনা-৩। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনী মাঠেও বেশ সরগরম। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আর বহিষ্কারের হিড়িক চলছে। ফলে সাধারণ ভোটাররা সহজ সমীকরণ কষছেন এবং তাদের চোখ ভিন্নদিকে ঘুরছে। এই আসনটিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের সময় নেতাকর্মীদের পাশে থাকা বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. রফিকুল ইসলাম হিলালী ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন।

তবে ধানের শীষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে নেতৃত্ব দেয়া নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং বিএনপির সাবেক জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল। দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘ঘোড়াথ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। একই দলের দুই জনপ্রিয় নেতা ভোটে অংশ নেয়ায় বিএনপিপন্থী ভোটারদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মো. খায়রুল কবীর নিয়োগী। এ ছাড়া আসনটিতে জাতীয় পার্টির মো. আবুল হোসেন তালুকদার, ইসলামী আন্দোলনের মো. জাকির হোসেন ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থী মো. শামছুজ্জোহা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

হাওর অধ্যুষিত নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) আসনে বিএনপির আলোচিত ও ভাটিবাংলার নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর ধানের শীষ নিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে জুলুম-নির্যাতনের শিকার এই নেতাকেই আগামী দিনে আবারও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারে দেখতে চান এই আসনের ভোটাররা।

তবে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থীর মাঝেও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আল হেলাল তালুকদার (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলনের মো. মুখলেছুর রহমান (হাতপাখা) ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির চম্পা রানী সরকার (কোদাল)।

জমিদারদের স্মৃতি বিজড়িত নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনটি একটি মাত্র উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনে বিএনপিতে কোন্দল থাকায় তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে। বিএনপির জনপ্রিয়তা থাকলেও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াত জোটের প্রার্থী শক্ত অবস্থানে যাচ্ছেন।

এই আসনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবু তাহের তালুকদার বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে মাঠে রয়েছেন। তবে নির্বাচনী সমীকরণে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যাপক মাছুম মোস্তফা (দাঁড়িপাল্লা) এগিয়ে রয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগ শাসনামলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় তখন থেকেই তৃণমূল ভোটারদের সঙ্গে তার বেশ সম্পৃক্ততা রয়েছে। আসনটিতে বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে দাঁড়িপাল্লার পাল্লা ভারী হচ্ছে।

সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষের মুখে বিএনপি থাকলেও অন্তরে দাঁড়িপাল্লা। এ ছাড়া এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম হাকিমিও বেশ সুপরিচিত।