আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম-খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিচার শুরু হয়েছে। রবিবার এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল (অব:) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা (গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত) ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ। ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ২০০৩ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্টে’ দায়মুক্তি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান। র্যাব গঠন একটি মারাত্বক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনালে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা জবানবন্দি দেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান।
সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে, ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে, তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।’
সেনাবাহিনীকে কখনও বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি উল্লেখ করে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র্যাব গঠনের আগে অপারেশন ক্লিন হার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’
আওয়ামী লীগের সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনায় ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরীণ করা হয় এবং সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালীন পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র্যাব ও সামরিক সদস্যদের নির্যাতনের কারণে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্যের মৃত্যু হয় বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ধারণা দেয়।’
তিনি বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হল, শেখ হাসিনা ভাবতেন, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।’
সাবেক এই সেনা প্রধান আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দিককে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হন।’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার সাক্ষ্যে বলেন, সেনাপ্রধান হওয়ার আগে থেকেই অন্যান্য সামরিক সদস্যদের মত তিনি র্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সেনাপ্রধান হবার পরপরই আমি র্যাবের এডিজি, তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন, আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তী কিছুদিন পত্রিকায় ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্দি করতে পারি ঘটনা (ক্রসফায়ার) ঘটছে, কিন্তু চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজির আহমেদ র্যাবের ডিজি (মহাপরিচালক) হন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন।’
জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, একপর্যায়ে জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন তিনি। পরে মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদীনের কাছ থেকে তিনি ফোন পান যে, প্রধানমন্ত্রী (তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বলেছেন, জিয়াউল আহসানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য।
সেনাপ্রধান থাকাকালে নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হল, আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি, আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দিই র্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার আগে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে।’
তিনি বলেন, ‘যারা ফেরত আসত (র্যাব থেকে) তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে সেনাবাহিনীর র্যাব সদস্যদেরকে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন র্যাব রক্ষীবাহিনীর চাইতেও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।’