জুল ভার্ন ছিলেন এমন এক কালজয়ী স্রষ্টা যিনি উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লবের আবহে বসে এমন সব প্রযুক্তির কথা ভেবেছিলেন, যা তখন বিজ্ঞানীদের চিন্তারও বাইরে ছিল। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
জুল ভার্নের জন্ম ১৮২৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের বন্দর নগরী নঁতে। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা এই শহরটিই সম্ভবত তার মনে অজানাকে জানার বীজ বুনে দিয়েছিল। তার পিতা পিয়েরে ভার্ন ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী এবং তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলেও আইন পেশায় আসুক। পারিবারিক চাপে পড়ে তরুণ জুল ভার্ন প্যারিসে আইন পড়তে যান ঠিকই, কিন্তু তার মন পড়ে থাকত সাহিত্য, থিয়েটার এবং বিজ্ঞানের নতুন সব আবিষ্কারে। প্যারিসে অবস্থানকালে তার পরিচয় হয় বিখ্যাত লেখক আলেকজান্ডার দুমা এবং ভিক্টর হুগোর সঙ্গে, যারা তাকে লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করেন।
শুরুর দিকে ভার্নের জীবন মোটেও সহজ ছিল না। তিনি শেয়ার বাজারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং দিনের বাকি সময়টা কাটাতেন লাইব্রেরিতে ভৌগোলিক মানচিত্র, গণিত এবং প্রকৌশলবিদ্যার বই পড়ে। ১৮৬৩ সালে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন প্রকাশক পিয়েরে-জুল হেতজেল তার প্রথম উপন্যাস ‘ফাইভ উইকস ইন এ বেলুন’ প্রকাশ করতে রাজি হন। এই বইটি রাতারাতি তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয় এবং এরপর থেকেই শুরু হয় তার বিখ্যাত সিরিজ ‘ভয়েজেস এক্সট্রা অর্ডিনারি’।
ব্যক্তিগত জীবনে ভার্ন ছিলেন একজন নিভৃতচারী এবং কঠোর পরিশ্রমী মানুষ। তিনি প্রতিদিন ভোরে উঠে লেখালেখি করতেন এবং তার লেখার প্রতিটি তথ্য যাচাই করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈজ্ঞানিক নথিপত্র ঘাঁটতেন। এমনকি অসুস্থতা এবং বার্ধক্যের দিনগুলোতেও তার কল্পনার ধার কমেনি। ১৯০৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন এমন সব গল্প, যা আজ আমাদের বাস্তব পৃথিবীর অংশ। জুল ভার্নের জীবনী আমাদের শেখায় যে, পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের ভেতরের সৃজনশীলতাকে লালন করলে কীভাবে একজন মানুষ শতাব্দীর গণ্ডি পেরিয়ে অমর হয়ে থাকতে পারেন।
কেন জুল ভার্ন আজও অনন্য
জুল ভার্নের গুরুত্ব কেবল তার সফল ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করার ক্ষমতায়। তাকে ‘আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের জনক’ বলা হয় কারণ তিনি কল্পকাহিনিকে অবাস্তব রূপকথার আড়াল থেকে বের করে এনে বিজ্ঞানের যুক্তিনির্ভর কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। তার গুরুত্বের প্রধান কারণ হলো তিনি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। সাইমন লেক (আধুনিক সাবমেরিনের উদ্ভাবক), আইজ্যাক আসিমভ কিংবা রবার্ট গডার্ডের (রকেট বিজ্ঞানের পথিকৃৎ) মতো বিজ্ঞানীরা সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, শৈশবে ভার্নের লেখা পড়েই তারা মহাকাশ বা সমুদ্র জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভার্ন কেবল আবিষ্কারের কথা বলেননি, তিনি সেই আবিষ্কারের সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়েও পাঠকদের ভাবিয়েছিলেন। যখন প্রযুক্তি ছিল খুব প্রাথমিক স্তরে, তখন তিনি দেখিয়েছিলেন যে মানুষের মেধা ও সাহস দিয়ে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার রচনাগুলো বৈজ্ঞানিক কৌতূহল এবং রোমাঞ্চের এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল, যা আজও লেখক, প্রকৌশলী এবং স্বপ্নদ্রষ্টাদের শিখিয়ে যায় যে আজ যা কল্পনা, কাল তা ধ্রুব সত্য। তাই আধুনিক সভ্যতা যতই উন্নতির শিখরে পৌঁছাক না কেন, প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের পেছনে জুল ভার্নের সেই আদি দূরদর্শী দৃষ্টির অবদান সবসময়ই অমøান থাকবে।
নটিলাস এবং সমুদ্রের অতল রহস্য
তার ‘টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাসে তিনি যখন নটিলাস নামক জাহাজের বর্ণনা দেন, তখন পৃথিবী আধুনিক সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের কথা চিন্তাও করতে পারেনি। ভার্ন কেবল একটি কাল্পনিক নৌকার কথা লেখেননি, তিনি সেটির গঠনশৈলী ব্যাখ্যা করেছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন যে এটি সম্পূর্ণ বিদ্যুৎশক্তির সাহায্যে চলত। তিনি সোডিয়াম ব্যাটারির মাধ্যমে ইঞ্জিনের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করেছিলেন যা বর্তমানের লিথিয়াম-আয়ন বা আধুনিক ইলেকট্রিক সাবমেরিনের পূর্বসূরি। ভার্ন নটিলাসের ভেতরে যে বিশাল জানালার বর্ণনা দিয়েছিলেন যা দিয়ে সমুদ্রের অতল তলের রহস্য দেখা যেত, তা আজ আধুনিক গবেষণামূলক জলযানগুলোতে বাস্তব রূপ পেয়েছে। এমনকি সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে সোডিয়াম আহরণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার যে বৈজ্ঞানিক ভাবনা তিনি সেখানে তুলে ধরেছিলেন, তা আজও মেরিন ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে বিস্ময়ের বিষয়। তিনি নটিলাসকে এমনভাবে ডিজাইন করেছিলেন যা সমুদ্রের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারে, যা আধুনিক ‘হাল’ (ঐঁষষ) ডিজাইনের মূল ভিত্তি।
মহাকাশ জয়ের পূর্বাভাস
মহাকাশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে জুল ভার্নের দূরদর্শিতা আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের চমকে দেয়। তার ‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ উপন্যাসে তিনি মানুষের চাঁদে যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তা ছিল প্রযুক্তিগত দিক থেকে অবিশ্বাস্যভাবে নিখুঁত। তিনি কল্পনা করেছিলেন যে ফ্লোরিডা থেকে একটি বিশাল কামানের গোলার মতো মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। এটি নিছক কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় যে, ১৯৬৯ সালে নাসা যখন অ্যাপোলো ১১ মিশন পরিচালনা করে, তখন সেই মহাকাশযানটিও ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকেই উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
ভার্ন তার বইতে যে মহাকাশযানের (কলম্বিয়াড) কথা বলেছিলেন তার আকার এবং ওজন ছিল আধুনিক কমান্ড মডিউলের প্রায় কাছাকাছি। এমনকি চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণের পর পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় সমুদ্রের পানিতে ল্যান্ড করার যে পদ্ধতি তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীতে লিখেছিলেন, নাসা ঠিক সেই পদ্ধতিটিই অনুসরণ করেছিল। ভার্ন গাণিতিকভাবে হিসাব করেছিলেন যে কক্ষপথে পৌঁছাতে হলে প্রতি সেকেন্ডে ৩৬,০০০ ফুট বেগের প্রয়োজন, যা আধুনিক ‘এস্কেপ ভেলোসিটি’র ধারণার খুব কাছাকাছি।
আধুনিক উড়োজাহাজের স্বপ্নদ্রষ্টা
আকাশে ওড়ার নেশা মানুষের চিরকালের, কিন্তু জুল ভার্ন একে দেখেছিলেন প্রকৌশলবিদ্যার দৃষ্টিতে। ‘রোবার দ্য কনকারার’ উপন্যাসে তিনি এমন এক আকাশযানের কল্পনা করেছিলেন যা ডানার ঝাপটায় নয় বরং প্রপেলার বা ঘুরন্ত পাখার মাধ্যমে আকাশে ভাসত। একে বর্তমানের হেলিকপ্টারের আদি নকশা বলা যেতে পারে। সে সময় যখন মানুষ বেলুনের সাহায্যে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করত, তখন ভার্ন যুক্তি দিয়েছিলেন যে বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো যন্ত্রকেই সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তিনি তার কল্পিত যানে অনেকগুলো ছোট ছোট ঘূর্ণায়মান পাখা ব্যবহার করার কথা লিখেছিলেন যা আধুনিক মাল্টিকপ্টার বা ড্রোনের প্রযুক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই উপন্যাসে তিনি অ্যালুমিনিয়ামের মতো হালকা ধাতুর ব্যবহারের কথা বলেছিলেন, যা আজকের বৈমানিক শিল্পের প্রধান উপাদান। তখনকার দিনে অ্যালুমিনিয়াম ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং বিরল ধাতু, তবুও তিনি এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। বাতাসের গতিবেগ এবং উচ্চতা মাপার জন্য তিনি যে ধরনের যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন তা আধুনিক এভিয়েশন প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইলেকট্রনিক যোগাযোগ
কেবল বড় বড় যন্ত্র নয়, জুল ভার্ন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের আধুনিকায়নের কথাও ভেবেছিলেন। তার একটি কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখা হলো ‘প্যারিস ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’। দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত থাকা এই বইটিতে তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা লিখেছিলেন যেখানে মানুষ কাচের তৈরি সুউচ্চ অট্টালিকায় বাস করবে।
তিনি সেখানে একটি যোগাযোগব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছিলেন যেখানে তারের মাধ্যমে লেখা বা ছবি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো যেত, যা আধুনিক ফ্যাক্স মেশিন বা ইন্টারনেটের আদি রূপ। এমনকি তিনি সেখানে এমন এক স্বয়ংক্রিয় গণনাকারী যন্ত্রের কথা বলেছিলেন যা অনেকটা আজকের কম্পিউটারের কাজ করত। বড় বড় দালান আলোকিত করার জন্য তিনি গ্যাস লাইটের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাতির যে বিশদ বর্ণনা দিয়েছিলেন তা টমাস আলভা এডিসনের বাতি আবিষ্কারের অনেক আগের ঘটনা। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের যে জাল বা গ্লোবাল নেটওয়ার্ক আজ আমাদের হাতের মুঠোয়, তার একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত তিনি এই লেখায় দিয়ে গিয়েছিলেন।
পৃথিবীর গহিন
‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ’ উপন্যাসে ভার্ন পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনের এক রোমাঞ্চকর বিবরণ দিয়েছেন। যদিও পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত মানুষের সরাসরি যাওয়া আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, কিন্তু তিনি যেভাবে ভূত্বকের স্তর এবং ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের বর্ণনা দিয়েছেন তা ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। তিনি সেখানে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের বেঁচে থাকার কথা লিখেছিলেন যা বিবর্তনবাদ এবং জীবাশ্ম বিজ্ঞান নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।
আবার তাঁর “দ্য ফ্লোটিং সিটি” উপন্যাসে তিনি আধুনিক প্রমোদতরীর যে বিশালতা ও সুযোগ সুবিধার বর্ণনা দিয়েছিলেন তা আজকের যুগের ওশান লাইনার বা ক্রুজ শিপের সাথে হুবহু মিলে যায়। তিনি সমুদ্রের ঢেউ থেকে শক্তি আহরণ করে যান্ত্রিক কাজ করার যে চিন্তা করেছিলেন তা বর্তমানের রিনিউয়েবল এনার্জি বা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে বিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলে কীভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায় সেই প্রকৌশলী মন-মানসিকতাই জুল ভার্নকে যুগের চেয়ে এগিয়ে রেখেছিল।
আগামীর জন্য অনুপ্রেরণা
জুল ভার্নের প্রতিটি উপন্যাস যেন ছিল এক একটি বৈজ্ঞানিক অভিসন্দর্ভ। তিনি কেবল অ্যাডভেঞ্চার লিখতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার রাস্তা দেখাতে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞানই হলো মানুষের একমাত্র হাতিয়ার যা দিয়ে সে প্রকৃতিকে জয় করতে পারে। তার লেখায় ফুটে ওঠা ‘সাবমেরিন ফোন’ কিংবা ‘ভিডিও কনফারেন্সিং’-এর মতো ধারণাগুলো আজ আমাদের জন্য সাধারণ বিষয়, কিন্তু ১৮৭০ সালে এগুলো ছিল ঐশ্বরিক কল্পনার মতো।
তার লিখনশৈলীতে একটি বিশেষ দিক ছিল তথ্যের নির্ভুলতা। তিনি যখন কোনো যন্ত্রের কথা বলতেন, তিনি সেটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং ব্যবহৃত উপাদানের ওজন পর্যন্ত উল্লেখ করতেন। এই গাণিতিক বিশুদ্ধতাই তাকে অন্যান্য সাধারণ লেখকদের থেকে আলাদা করে একজন ‘ভবিষ্যৎদ্রষ্টা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি জানতেন যে মানুষের কল্পনা যখন নির্দিষ্ট তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়, তখন তা আর গল্প থাকে না বরং তা হয়ে ওঠে আগামীর বাস্তবতা।
জুল ভার্ন আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে স্বপ্ন দেখতে জানলে এবং সেই স্বপ্নকে বিজ্ঞানের আলোয় বিচার করলে কোনো কিছুই আর অসম্ভব থাকে না। তার উত্তরাধিকার আজও বেঁচে আছে প্রতিটি মহাকাশ অভিযানে, সমুদ্রের গভীরে চালিত প্রতিটি সাবমেরিনে এবং আমাদের হাতের স্মার্টফোনে। তিনি ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা যিনি ঊনবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীর মানব সভ্যতাকে দেখতে পেয়েছিলেন। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এই মহামিলনই জুল ভার্নকে পৃথিবীর ইতিহাসের এক অনন্য এবং অপরিহার্য চরিত্রে পরিণত করেছে।