‘সরকার নির্ধারণী’ আসনে লড়াইয়ের আভাস

সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত। অতীতে এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান, সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এ ছাড়া এই আসনের একটি বিশেষ কাকতালীয় ঘটনা হলো স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে এখানে যে দল জয়ী হয়েছে, সেই দলই কেন্দ্রে সরকার গঠন করেছে। এ কারণে সিলেট-১ আসনের ফলাফলের প্রতি সারা দেশের নজর থাকে। এই এলাকায় অবস্থিত হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে। এসব কারণে আসনটির প্রতি বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে এ আসনে লড়াই হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। এ শূন্যস্থান পূরণ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এখন বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। মর্যাদাপূর্ণ এ আসনে জয়ের জন্য বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই মরিয়া।

বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির (ধানের শীষ) ও জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নারী, তরুণ, সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে। ভোটের অতীত রেকর্ড ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে অনেকে বিএনপিকে এগিয়ে রাখলেও অনেকে আবার বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থান অতীতের হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

দুই প্রার্থীর কঠিন লড়াই আঁচ করতে পেরেছে বিএনপি ও জামায়াতও। গত কয়েক দিন ধরে দুই দল পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলছে। বিএনপি প্রার্থী খন্দকার মুক্তাদিরের ৮৪০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করছে জামায়াত। মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামসহ নেতারা এ নিয়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাল্টা অভিযোগে বিএনপি বলছে, জামায়াত প্রার্থী হাবিবুর রহমান হলফনামায় ব্যাংক ঋণ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গোপন করেছেন। গতকাল সোমবার বিএনপির পক্ষ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তার প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে।

বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, হাবিবুর রহমান ইবনে সিনা হাসপাতাল সিলেট লিমিটেডের পরিচালক ও আল কারামাহ মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার। কিন্তু হলফনামায় এসব উল্লেখ করেননি। ইবনে সিনা হাসপাতালের নামে ২৪ কোটি টাকা ঋণের কথাও গোপন করা হয়েছে। এটি নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন। এ ছাড়া বিএনপি দাবি করেছে, জামায়াত কিছু ভোটকেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, টাকা দিয়ে ভোট কিনছে এবং সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মহানগর আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চলছে। তার বিনিয়োগ আয়কর রিটার্নে উল্লেখ আছে। ইবনে সিনা হাসপাতালে তিনি শুধু প্রতিনিধি, কোম্পানির ঋণ তার ব্যক্তিগত নয়। ভোট কেনা ও সংখ্যালঘু ভয় দেখানোর অভিযোগ মিথ্যা।

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেও দুই প্রার্থীর নেতাকর্মীরা অবিরাম প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পথসভা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, কুশল বিনিময় সব মিলিয়ে নির্বাচনী আমেজ জমে উঠেছে। এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির আনোয়ার হোসেন সুমন (কাস্তে), বাসদের প্রণবজ্যোতি পাল (মই), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা), গণ অধিকার পরিষদের আকমল হোসেন (ট্রাক), ইনসানিয়াত বিপ্লবের শামিম মিয়া এবং সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস।

বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও জামায়াত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান নিজ নিজ জয়ের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।