নির্বাচন হোক সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য

বাংলাদেশ এখন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। ২০২৪ সালের আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলো শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং দীর্ঘ দেড় দশকের একরৈখিক রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। আগামীকালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের পালা নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের কঠিন পরীক্ষা। একদিকে যেমন পুরনো ঘরানার ভোটের রাজনীতি ও কৌশল সক্রিয়, অন্যদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা নতুন সমীকরণ প্রচলিত রাজনীতির ব্যাকরণ বদলে দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ২০২৬ সালের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। তবে সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর জনতাত্ত্বিক বিন্যাস। মোট ভোটারের প্রায় ৫ কোটি তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। এদের মধ্যে দেড় কোটিরও বেশি ভোটার এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন। এই তরুণ প্রজন্ম কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, তারা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী বা সাক্ষী। ফলে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রচলিত উন্নয়ন-বয়ান বা পরিচিত প্রার্থীর মুখ আর তাদের সন্তুষ্ট করছে না। তাদের ভোটের মানদণ্ড এখন সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও টেকসই রাষ্ট্র সংস্কার। যেখানে একসময় ভোট নির্ধারিত হতো দলীয় প্রতীক বা উত্তরাধিকারভিত্তিক আনুগত্যে, সেখানে এই সচেতন তরুণ সমাজ এখন গুরুত্ব দিচ্ছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা ও সংস্কারের সদিচ্ছাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারণার প্রভাবে এই সচেতনতা গ্রাম-শহর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এটাই রাজনীতির নতুন সমীকরণ, যা বড় দলগুলোর চিরাচরিত কৌশলকে চ্যালেঞ্জ করছে। এবারের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাই ভোট পড়বে শুধু মার্কা নয়, মূলত আগামীর কাক্সিক্ষত ব্যবস্থার পক্ষে।

নির্বাচনের মাঠে বিএনপি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি গ্রাম-গঞ্জে তাদের তৃণমূল সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠন করেছে। বিএনপির কৌশল হচ্ছে, রাজনৈতিক জনসমর্থনকে ব্যালট বাক্সে রূপান্তর করা। প্রায় ২৮৫টি আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা ক্ষমতার মূল দাবিদার। তাদের ইশতেহারে বা বুলেট ট্রেনের মতো মেগা প্রজেক্টের প্রতিশ্রুতি, ভোটারদের নজর কাড়তে সাহায্য করছে। অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। নাহিদ ইসলামসহ তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলটি জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি সাজাচ্ছে। তাদের মূল শক্তি কোনো ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংক নয়, বরং জনগণের আকাক্সক্ষা। এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা মনে করেন, গতানুগতিক দলগুলো দিয়ে প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়। ফলে তারা একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এবারের নির্বাচনী রণক্ষেত্রে গতানুগতিক দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরে, প্রধানত তিনটি শক্তির মহড়া লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, প্রায় তিন দশক পর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপি এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলটির মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। তাদের বিশাল তৃণমূল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে দলটি ৩০০ আসনেই একক বা জোটবদ্ধভাবে বিজয়ী হতে মরিয়া। দ্বিতীয়ত, ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সবচেয়ে বড় চমক হলো, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।

জামায়াতের সুশৃঙ্খল ক্যাডার শক্তি এবং এনসিপির তারুণ্যনির্ভর সংস্কারক ভাবমূর্তি মিলে, ভোটের মাঠে এক অপরাজেয় রসায়ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন ভোটারদের বড় একটি অংশ এই জোটের দিকে ঝুঁকছে। তৃতীয়ত, জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি তাদের হারানো দুর্গ পুনর্দখলে ব্যস্ত। তারা মূলত লাঙ্গল প্রতীকের অনুগত ভোটারদের ওপর ভর করে সংসদে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের সমীকরণই বলে দেবে, আগামীকালের নির্বাচনের পর ক্ষমতার পাল্লা কোন দিকে হেলবে? রাজনীতির সমীকরণ কেবল আদর্শিক লড়াইয়ে নয়, বরং চাল-ডাল-তেলের দামেও নির্ধারিত হয়। বর্তমানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রিজার্ভ সংকটের যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, ভোটাররা সরাসরি তার প্রভাব অনুভব করছেন। পরিসংখ্যান বলছে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারদের বড় অংশ মনে করছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যে দল দিতে পারবে, তাদের দিকেই তারা ঝুঁকবে। বিশেষ করে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। ভোটাররা এখন মেগা প্রজেক্টের চেয়ে টেকসই অর্থনীতির নিশ্চয়তা বেশি চায়। এবারের নির্বাচনে প্রচারণা মাঠ ছেড়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবে স্থানান্তরিত হয়েছে। ডিজিটাল প্রচারণা এখন গতানুগতিক জনসভার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আইটি সেল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখছেন। তবে ভুয়া খবর রুখে দিয়ে সঠিক তথ্য ভোটারদের কাছে পৌঁছানো নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। যেহেতু তরুণরা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা এগিয়ে থাকবে, ভোটের লড়াইয়ে তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। যদিও নির্বাচনী প্রচারণা শেষ, তবু আগামীকালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা হবে। সেই প্রচারণায় যেন আমরা সবাই ধৈর্য সহকারে নিজেকে সংযত রাখি। 

বাংলাদেশের রাজনীতি কখনোই ভূ-রাজনীতির বাইরে নয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, চীনের বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের চাপ এই ত্রিমুখী প্রেক্ষাপটে জয়ী হওয়া দলের জন্য দেশ চালানো হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি এবং পোশাক খাতের অস্থিরতা যে অবস্থায় আছে, তাতে ভোটারদের কাছে মূল প্রশ্ন কার আমলে বাজারদর কমবে? রাজনীতির এই অন্তিম সমীকরণে দাঁড়িয়ে কোনো একক বিজয়ীর নাম অগ্রিম ঘোষণা করা এখন প্রায় অসম্ভব। এর পেছনে বেশ কিছু শক্তিশালী বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, এনসিপি ও ছাত্র শক্তির উত্থানের ফলে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের সুসংহত ভোট ব্যাংকে বড় ধরনের ভাঙন ধরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রায় ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার এবং সচেতন সুশীল সমাজের ভোট শেষ মুহূর্তে কোন দিকে যায়, তা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। তৃতীয়ত, চিরাচরিত প্রচারণার বদলে এবার সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন ভোটারদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। এই বহুমুখী প্রভাব ও ভোট বিভাজনের মারপ্যাঁচে নির্বাচনী ফলাফল যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তবে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের রায়। এই দলটি নির্বাচনে নেই, কিন্তু তাদের সমর্থক গোষ্ঠী বিশাল। এদের মধ্যে অর্ধেকও যদি ভোট দেয়, তাহলেও নির্বাচন প্রভাবিত হবে। এখানেই প্রশ্ন, এই সমর্থক গোষ্ঠীর রায় কোন দল পাবে? এটা অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বিক্ষিপ্তভাবে এদের ভোট যারা বেশি পাবে, তারাই বিজয়ের মুখ দেখতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী আদর্শের ঘরেই হয়তো ভোট পড়বে আওয়ামী সমর্থকদের। যদি এই আদর্শের ৫০ ভাগ সমর্থকও ভোট দেন, তাহলে কোনোভাবেই বিএনপিকে আটকানো যাবে না। বিজয়ের শেষ হাসি তারাই হাসবেন। তবে আরেকটি পক্ষ বলছে, এককভাবে কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করতে পারবে না। সরকার গঠিত হবে, যৌথ রাজনৈতিক দলের শক্তিতে। 

আগামীকালের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি পুরনো ধারা বনাম পরিবর্তনকামী শক্তির লড়াই। জয় যে দলেরই হোক না কেন, তাকে মাথায় রাখতে হবে যে- ২০২৪-এর গণআন্দোলনের চেতনাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করা অসম্ভব। ভোটাররা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা কেবল নেতা চায় না, তারা ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। জয়ী হবে তারা, শেষ পর্যন্ত হাসবেন তারাই, যারা নতুন সমীকরণ অনুধাবন করে পুরনো কৌশল সংস্কার করতে পেরেছেন। একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করাই বড় কথা নয়, মূল বিষয় হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রেখে, দেশকে শক্তিশালী অর্থনীতির পথে অগ্রসর করা। পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে নিজেকে উত্তীর্ণ করতে হলে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এসে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। আগামীকালের নির্বাচন সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হোক, এই প্রত্যাশা থাকল।

লেখক: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

 jasim68a09786@gmail.com