নির্বাচনের আগে ভুল তথ্যের ‘বন্যা’, অধিকাংশ ভারত থেকে

১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে অপতথ্য ও ভুয়া প্রচারণার এক ধরনের ‘বন্যা’ বইছে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এসব বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমন্বিতভাবে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের ঢল ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ অপতথ্যের বড় অংশই আসছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা এবং পরে তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন।

কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনলাইনে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে, তা দমনে বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এসব অপতথ্যের মধ্যে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবিও রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্কের কাছে সহায়তা চেয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে ‘ভুল তথ্যের বন্যা’ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এটি বিদেশি গণমাধ্যম ও স্থানীয়Ñ উভয় উৎস থেকেই আসছে। এ অপতথ্যের বড় একটি অংশ ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশই অমুসলিম, যাদের অধিকাংশ হিন্দু। এ নিয়ে অনলাইনে ব্যাপকভাবে দাবি ছড়ানো হচ্ছে যে, হিন্দুরা বাংলাদেশে হামলার শিকার হচ্ছে, যেখানে ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানিয়েছে, তারা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে তৈরি সাত লাখের বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে, যেখানে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ‘হিন্দু গণহত্যা’র দাবি করা হয়েছে। থিংক ট্যাংকটির প্রধান রাকিব নায়েক বলেন, আমরা অনলাইনে সমন্বিত ভারতীয় অপতথ্য শনাক্ত করেছি। এসব অপতথ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। তিনি জানান, এ কনটেন্টের ৯০ শতাংশের বেশি ভারত থেকে এসেছে। বাকিগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সংশ্লিষ্ট হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এএফপি ফ্যাক্ট চেক দল ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত এআই-তৈরি ভিডিও শনাক্ত করেছে। এর খুব কম ভিডিওতেই এআই ব্যবহারের সতর্কবার্তা বা ঘোষণা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বছরের পর বছর দমনপীড়নের পর এ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সে সময় বিরোধীদের দমন করার পাশাপাশি ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠও রোধ করা হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব অপপ্রচারের বেশিরভাগই ভারত থেকে ছড়ানো হলেও এগুলো ভারত সরকার পরিকল্পিতভাবে করছে কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা বাংলাদেশে ‘চরমপন্থিদের’ মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর ‘পরিকল্পিত হামলার ধরন’ লক্ষ করেছে। তবে তারা বাংলাদেশে ‘অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচনের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।