গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানে অন্তত ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনি এমনভাবে নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের দেহাবশেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি—আল জাজিরার এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনই দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ তাপমাত্রাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহারের ফলে অনেকের দেহ সম্পূর্ণভাবে বাষ্পীভূত হয়ে গেছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রচারিত আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন 'দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি'-তে জানানো হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজার সিভিল ডিফেন্স দলের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'বাষ্পীভূত' হিসেবে চিহ্নিত ২,৮৪২ জনের হিসাব অনুমাননির্ভর নয়; বরং ঘটনাস্থলভিত্তিক তথ্য-নথির ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আল জাজিরাকে বলেন, কোনো ভবনে হামলার পর উদ্ধারকারীরা সেখানে কতজন ছিলেন সেই তথ্য পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নেন এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
'যদি পরিবার জানায় ভেতরে পাঁচজন ছিলেন, কিন্তু আমরা তিনটি মরদেহ পাই, তাহলে বাকি দু'জনকে 'বাষ্পীভূত' হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আগে আমরা ধ্বংসস্তূপ, হাসপাতাল ও মর্গে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালাই। কিছু না পেলে—শুধু রক্তের ছিটা বা চামড়ার ক্ষুদ্রাংশ ছাড়া—তবেই এভাবে শ্রেণিবদ্ধ করি', বলেন বাসাল।
প্রতিবেদনে এমন অনেক পরিবারের সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, যারা হামলার পর প্রিয়জনদের আর কোনো খোঁজ পাননি।
ইয়াসমিন মাহানি জানান, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলে ইসরায়েলি হামলার পর ভোরে ধ্বংসস্তূপে ছেলের খোঁজে যান তিনি।
'মসজিদের ভেতরে ঢুকে দেখি পায়ের নিচে মাংস আর রক্ত', বলেন তিনি।
ছেলে সাদের কোনো দেহাবশেষ তিনি পাননি। তিনি আরও বলেন, 'দাফন করার মতো একটা দেহও পাইনি। এটাই সবচেয়ে কষ্টের।'
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নিখোঁজের পেছনে তাপীয় ও থার্মোবারিক (ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসোল) বোমার ব্যবহার দায়ী হতে পারে। রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ বলেন, এ ধরনের অস্ত্র বিস্ফোরণের আগে জ্বালানি মিশ্রিত ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়, যা জ্বলে উঠে প্রচণ্ড তাপ ও চাপ সৃষ্টি করে।
'অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও টাইটানিয়ামের গুঁড়া মিশ্রিত করলে বিস্ফোরণের তাপমাত্রা ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে', বলেন তিনি।
প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এমকে-৮৪ বোমা, ব্লু-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার ও জিবিইউ-৩৯ প্রিসিশন গ্লাইড বোমার ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আল-তাবিন স্কুলে হামলায় জিবিইউ-৩৯ ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ফাতিগারভের ভাষ্য, এ বোমা ভবনের কাঠামো অক্ষত রেখে ভেতরের সবকিছু ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি চাপ ও তাপীয় তরঙ্গের মাধ্যমে ফুসফুস ছিদ্র করে দেয় এবং নরম টিস্যু পুড়িয়ে ফেলে।
সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, একাধিক হামলাস্থল থেকে জিবিইউ-৩৯ বোমার অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল ঘোষিত 'নিরাপদ অঞ্চল' আল-মাওয়াসিতে এক হামলায় ব্লু-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার ব্যবহৃত হয়, যাতে ২২ জন 'বাষ্পীভূত' হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ বোমায় স্টিল কেসিং ও বিলম্বিত ফিউজ রয়েছে, যা ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয়ে ব্যাপক আগুনের গোলা সৃষ্টি করে।
এছাড়া ৯০০ কেজি ওজনের এমকে-৮৪ 'হ্যামার' বোমার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ট্রিটোনাল নামে বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয় এবং যা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মুনির আল-বুরশ বলেন, মানবদেহের প্রায় ৮০ শতাংশই পানি।
'পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যখন ৩,০০০ ডিগ্রির বেশি তাপ ও প্রচণ্ড চাপ একসঙ্গে কাজ করে, তখন দেহের তরল তাৎক্ষণিক ফুটে ওঠে, টিস্যু বাষ্পে পরিণত হয়ে ছাই হয়ে যায়—এটি রাসায়নিকভাবে অবশ্যম্ভাবী', বলেন তিনি।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, দায় শুধু ইসরায়েলের নয়।
'এটি একটি বৈশ্বিক গণহত্যা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে ধারাবাহিকভাবে এসব অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে, যদিও তারা জানে এগুলো যোদ্ধা ও শিশুর মধ্যে পার্থক্য করে না', বলেন তিনি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও এবং নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন অধ্যাপক তারিক শানদাব বলেন, 'গাজার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।' তিনি খাদ্য ও ওষুধ অবরোধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অন্যান্য দেশের আদালতে সার্বজনীন এখতিয়ার প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে আইনি পরিভাষা খুব সামান্যই সান্ত্বনা দেয়। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে এক হামলায় চার সন্তান হারানো রফিক বদরান বলেন, তিনি কেবল কিছু দেহাংশই কবর দিতে পেরেছেন।
'আমার চার সন্তান যেন বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। অসংখ্যবার খুঁজেছি—এক টুকরোও পাইনি। তারা কোথায় গেল?'