জনগণের জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু 

জনগণের দিক থেকে আশা ছিল মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে। চব্বিশের আন্দোলনের পর আজ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘদিনের আকাক্সিক্ষত নির্বাচন ও গণভোট হতে যাচ্ছে। জনগণ ভেবেছিল বিপ্লব আসবে সামাজিক ব্যবস্থায়, বদলে যাবে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির পূর্ববর্তী সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক। সবার উন্নতির মধ্য দিয়েই উন্নতি ঘটবে ব্যক্তি মানুষের। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণভাবে ঘটেনি। ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছে সমষ্টির প্রশস্ত ঘাড়ে পা রেখে। ফলে সমষ্টি তো নেমেছেই, ব্যক্তিও উঁচু হতে পারেনি। বাঙালি আগেও প্রান্তবর্তী ছিল এখনো সেই প্রান্তবর্তীই রয়ে গেল। ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘর্ষের রূপ নেয়। একেবারে উঁচু থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র ওই একই ঘটনা, একই রকমের কলহ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ছিনতাই, খুনোখুনি। পথে-ঘাটে ছিনতাই হয়, হবেই; রাষ্ট্রক্ষমতাও তো ছিনতাই হয়ে গেছে, একাধিক বার। এরশাদ যে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনতাই করেছিলেন, সেটাও কতিপয়ের স্বার্থে এবং রাজনীতিকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সুযোগকে ব্যবহার করে। এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। পরিণতিতে নির্বাচন পাওয়া গেছে। একাধিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু তাতে পুরনো নীতির কোনো বরখেলাপ ঘটেনি, জনগণের তেমন একটা লাভ হয়নি, লাভ হয়েছে কিছু মানুষের।

জনগণের শ্রমের সৃষ্ট ফসল আত্মসাৎ করে এই যে ব্যক্তির উত্থান একে আর যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্মত বলার কোনো উপায় নেই। উল্টোটাই বলা সংগত, যদিও বলা হয় না। সত্য হচ্ছে এটা যে, মুক্তিযুদ্ধ অল্প কিছু মানুষের মুক্তি চায়নি, অন্য সবাইকে বন্দি রেখে। মুক্তি চেয়েছে সবার, যাতে মুক্তি ঘটে প্রত্যেকের। সেটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যার অপর নাম প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা সে গণতন্ত্র অবৈধ স্বৈরাচারের জায়গাতে ছদ্মবেশি কিংবা বৈধ স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা নয়, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা বটে। কতিপয়ের যে শাসন দেশে প্রতিষ্ঠিত, তা নির্বাচনের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হোক, কিংবা প্রতিষ্ঠা পাক জবরদখলের সাহায্যে, কিংবা যে কোনো উপায়ে, তাকে স্বৈরাচার ভিন্ন অন্য কিছু বলার উপায় নেই, উপায় থাকে না। এটা কেবল যে বাংলাদেশে ঘটছে তা নয়, ঘটছে সমগ্র পুঁজিবাদী বিশ্বে। পুঁজিবাদের মূল দর্শনটা এই রকমের যে, যোগ্যরা টিকবে, অযোগ্যদের হটিয়ে দিয়ে। তারাই যোগ্য যাদের পুঁজি আছে; কিংবা যারা পুঁজির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত; যারা শ্রমজীবী তারা অবশ্যই অযোগ্য। ওই যোগ্যরা যে শাসন ব্যবস্থা চালু রাখে, সেটা তাদের অর্থাৎ অল্পসংখ্যকের স্বার্থকেই পুষ্ট করে এবং জনগণের স্বার্থকে পদদলিত করে। যোগ্যদের এই শাসনের নানাবিধ কুফল জ¦লজ¦ল করতে থাকে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আদর্শস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোটে জয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারে পৃথিবী জুড়ে অশান্তি, অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোনো রাষ্ট্রই আজ নিরাপদে নেই ট্রাম্পের হিংস্র আগ্রাসন থেকে। বিশ্বব্যবস্থা আজ হুমকির কবলে। দেশের সম্পদ থাকাও যে দেশের জন্য হুমকি, সেটা ট্রাম্পের আগ্রাসনে প্রমাণিত হয়েছে।

পুঁজিবাদ নিজেই একটি অপরাধ, মস্ত বড় অপরাধ। তার শক্তি উদ্বৃত্ত মূল্য অপহরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওই উদ্বৃত্ত মূল্য আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না, শ্রমজীবীরাই তা সৃষ্টি করে, নিজেদের শ্রম দিয়ে। শীর্ষ অপরাধী যে নিজেই তার পক্ষে অজস্র অপরাধের জন্ম দেওয়াটাই স্বাভাবিক এবং জন্ম সে দিচ্ছেও বটে। অপরাধীর শাস্তি দেওয়ার দায়িত্বও আবার ওই ব্যবস্থারই হাতে; কিন্তু নিজেই যে অপরাধের জন্মদাতা এবং জন্মঅপরাধী, সে কী করে অপরাধীকে শায়েস্তা করবে। পারছে না সেটা করতে যে জন্য অপরাধ বাড়তেই থাকবে, বৃদ্ধি পায় আদালত ও উকিলের সংখ্যা, হ্রাস পায় না অপরাধীদের ক্রমবর্ধমানতা। বাংলাদেশেও অবিকল সেটাই ঘটছে। ঘটতে থাকবে যদি রুখে না দাঁড়ানো যায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অবদান হচ্ছে মৌলবাদ, যা এখন বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং সমগ্র বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী ধিক্কারধ্বনিতে এ সত্যটি যেন তলিয়ে না যায় যে, উগ্র মৌলবাদীরা উৎপাদিত হয়েছে পুঁজিবাদীদের কারখানাতেই। প্রত্যক্ষভাবে যেমন, তেমনি অপ্রত্যক্ষভাবেও। প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা সবাই জন্য থাকার কথা। সমাজতন্ত্রীদের উৎখাত করার জন্য মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলোতে যে যুবকদের লালন-পালন করেছে, অর্থ দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের, তারাই পরে তালেবান নাম নিয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়ে মৌলবাদী এক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। তখন তাদের শত্রু ছিল সমাজতন্ত্রীরা; সমাজতন্ত্রীরা যখন মাঠে নেই, সেই শত্রুকে সামনে না পেয়ে তালেবানরা পরবর্তী সময় তাদেরই স্রষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে শত্রু করে তুলেছিল। দখলদার মার্কিনিদের হটিয়ে আফগানিস্তান তালেবানে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ। দৈত্য যখন কাজ না পায়, তখন মনিবের ঘাড়ে হাত দেয়। দৈত্যের সব কাজই অন্যায় ক্রিয়া, অন্যায় ছাড়া সে থাকতে পারে না। পারে না বলেই এখন তাদের দৌরাত্ম্য সভ্যতাবিধ্বংসী রূপ পরিগ্রহ করেছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব এক দৈত্যকে নিবৃত্ত তো পরের কথা, নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না। দৈত্য বড়ই বেয়াড়া। কিন্তু পুঁজিবাদের সঙ্গে মৌলবাদের যে দ্বন্দ্ব সেটা গভীর নয়, মৌলবাদের গভীর ও মৌলিক দ্বন্দ্ব হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, মৌলবাদ এবং পুঁজিবাদের মধ্যে মিলবার কোনো জায়গা নেই। মৌলবাদ পশ্চাৎপদ, পুঁজিবাদ হচ্ছে আধুনিক। চেহারাসুরৎ, পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। কিন্তু দুয়ের মধ্যে আদর্শগত ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে এবং কেমন করে অস্বীকার করব এই সত্য যে, আদর্শিক ঐক্যই হচ্ছে মূল ব্যাপার, তার বাইরে যা রয়েছে তা অমৌলিক, অনেকাংশে পোশাকি। আদর্শিক ঐক্যটা এখানে যে, উভয় মতবাদী ব্যক্তির স্বার্থকে প্রধান করে তোলে সমষ্টির স্বার্থকে উপেক্ষা ও পদদলিত করে। মৌলবাদীরা মোক্ষ খোঁজে। সে মোক্ষ অবশ্যই ব্যক্তিগত। তাদের ধর্ম চর্চাটাকে মনে হয় অলৌকিক, আধ্যাত্মিক। কিন্তু আসলে সেটা পুঁজি সঞ্চয়। তাদের পুণ্য এক প্রকারের পুঁজি বটে, ব্যক্তিগত পুঁজি; এর ক্ষেত্রে ইহকাল-পরকাল উভয় ভূমি পর্যন্ত প্রসারিত। তারাও মুনাফাতন্ত্রী। নিজের পুঁজি বৃদ্ধির জন্য মৌলবাদীরা অন্যের ওপর অত্যাচার করে, মানুষ মারতে পর্যন্ত পিছ পা হয় না, মূর্তি ভাঙতে তাদের হাত কাঁপে না। অন্ধকারকে লালন করে, অন্ধবিশ্বাসকে উত্তেজিত করে তোলে, সমষ্টিগত অগ্রগতিকে ঠেলতে থাকে পেছন দিকে। সবাইকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেরা এগোতে চায়। নিজেরা নয়, চূড়ান্ত বিচারে প্রত্যেক মৌলবাদীই ব্যক্তিগত, নিজের জন্য কাজ করছে; নিজের মুক্তি ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না।

মৌলবাদীরা আবার ভোগবাদীও বটে, তাদের স্বর্গ ভোগের উপকরণ দিয়ে ঠাসা। পুঁজিবাদীদের স্বর্গের সঙ্গে তাদের স্বর্গের মৌলিক কোনো ব্যবধান নেই। পুঁজিবাদের আদর্শিক মুখচ্ছবি দুটি। একটি উদারনীতিক, অপরটি ফ্যাসিবাদী; উদারনীতি অত্যন্ত ভদ্র, ফ্যাসিবাদ ভয়ংকররূপে আক্রমণাত্মক। কিন্তু ভেতরে তাদের একই কারবার। উদারনীতি ভান করে নিরপেক্ষতার। কিন্তু জগৎ সংসারে নিরপেক্ষতা বলে তো কিছু নেই, বিশেষ করে সেই পরিস্থিতিতে, যেখানে লড়াই চলছে শুভের সঙ্গে অশুভের, ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে সমষ্টিগত মঙ্গলের। এই যুদ্ধে উদারনীতি যদি বলে সে নিরপেক্ষ তাহলে বুঝতে অসুবিধা কোথায় যে, আসলে সে ব্যক্তির পক্ষেই, সমষ্টির পক্ষে নয়। উদারনীতি অবাধ প্রতিযোগিতায় বিশ্বাস করে, যার অর্থ সে প্রবলের সমর্থক, দুর্বলের বিপক্ষে। ফ্যাসিবাদও তাই; সেও প্রবলকে বিকশিত করতে চায়, দুর্বলকে লাঞ্ছিত করে। দুয়ের মধ্যে তফাত ওই ভদ্রতারই। ফ্যাসিবাদ ভদ্রতার ধার ধারে না, সে নগ্ন উন্মোচিত, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রতি তার সমর্থনটা উগ্র ও প্রত্যক্ষ, রাখঢাক করে না, উদাহরণ ট্রাম্প। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীরাও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকেই রক্ষা করতে চায়, তারাও ব্যক্তিস্বার্থ দেখে, সমষ্টি স্বার্থের বিপরীতে। তারাও উগ্র, তারাও ভয়ংকর।

মৌলবাদী ও পুঁজিবাদীরা যে পরস্পরের আপনজন সেটা পরিষ্কার হয় সমাজতন্ত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করলে। উভয়েই সমাজতন্ত্রবিরোধী। তার কারণ সমাজতন্ত্র ব্যক্তিকে বড় করে তোলে না; ব্যক্তিকে সে রক্ষা করতে চায় সমষ্টিকে বিকশিত করে। একের বোঝা সে দশের ওপর চাপায় না; বোঝাটিকে দশের সম্পত্তিতে পরিণত করে যাতে দশজনই চলতে পারে সমান বেগে, অগ্রগতি ঘটে সবার। পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রকে শত্রু মনে করে; পুঁজিবাদ চায় অল্পলোকের মঙ্গল, অন্য সবার শোষণ ঘটিয়ে। ধর্মীয় মৌলবাদ বলে সমাজতন্ত্রকে সে ঘৃণা করে, কারণ সমাজতন্ত্র হচ্ছে বস্তুবাদী। কিন্তু মৌলবাদীরাও ভেতরে ভেতরে বস্তুবাদীই, তারাও সুখ চায়, যে সুখ বস্তুর দখলদারির ওপর নির্ভর করে, যে জন্য তালেবানরা মাদ্রাসায় থাকে না, অস্ত্র হাতে নিয়ে সিংহাসন দখলে লিপ্ত হয়। আর বিশ্বের সর্বত্রই দেখা যায়, দেখা গেছে অতীতেও যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে পবিত্র বলে মনে করে; ধনী ধনীই থাকবে, যেমন গরিব থাকবে গরিব, শুধু দেখতে হবে সবাই ধর্মের পথে আসে কি-না, নাকি বিচ্যুত হচ্ছে। সার কথা হচ্ছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আজকের নির্বাচন কতটুকু জনগণের কথা বলবে তা বড় ধরনের  প্রশ্ন বৈকি। এর ফলে কি সত্যিকারভাবে জনগণ মুক্তি পাবে? আসলেই কি জয় আসবে তাদের পক্ষেই! এখানে একটা বড় ধরনের ‘কিন্তু’ থেকেই যায়।

লেখকঃ ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়