আল্লাহর রহমত ছাড়া বান্দার জীবনে প্রকৃত মুক্তি কল্পনাও করা যায় না। মানুষের চেষ্টা, সাধনা ও আমল যতই হোক না কেন, সব কিছুর চূড়ান্ত ফল নির্ভর করে আল্লাহর রহমতের ওপর। বান্দা যখন আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় পায়, তখন তার জীবনের কঠিন পথগুলো সহজ হয়ে যায়, জটিল সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধানের দিকে এগোয়। রহমত এমন এক নেয়ামত, যা মানুষের অক্ষমতাকে শক্তিতে রূপ দেয় এবং হতাশ হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়।
বান্দার জীবনে আল্লাহর রহমত কেবল পরকালের মুক্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, দুনিয়ার প্রতিটি অধ্যায়েও এর স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। বিপদের মুহূর্তে অপ্রত্যাশিত সহায়তা, দুঃখের ভেতর প্রশান্তি, ভুলের পর তওবার সুযোগ, এসবই আল্লাহর রহমতের বহিঃপ্রকাশ। মানুষ যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে এবং তার ওপর ভরসা রাখে, তখন আল্লাহ তার জন্য এমন পথ খুলে দেন, যা সে নিজেও কল্পনা করতে পারেনি।
আল্লাহর রহমত মানুষকে অহংকার থেকে রক্ষা করে এবং বিনয়ের শিক্ষা দেয়। কারণ বান্দা তখন বুঝতে পারে, তার সাফল্য তার যোগ্যতার ফল নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ রহমত। তাই একজন মুমিনের জীবন হওয়া উচিত রহমতের প্রত্যাশায় ভরা, আমলে সচেষ্ট এবং অন্তরে সদা বিনয়ী। এই অবস্থানেই বান্দার জীবন সার্থকতা লাভ করে।
মানুষ একটু বেশি আমল করলে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবতে শুরু করে। কোনো ক্ষেত্রে তারা অন্যদের খুব খাটো নজরে দেখতে শুরু করে। এটা মোটেই ঠিক নয়। কারণ মানুষ শুধু আমলের ওপর ভর করে জান্নাতে যেতে পারবে না, যদি মহান আল্লাহর রহমত না থাকে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কোনো ব্যক্তিকে তার নেক আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকেও নয়? তিনি বলেন, আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তার রহমত ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন। কাজেই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো এবং নৈকট্য লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যেন
মৃত্যু কামনা না করে। কেননা সে ভালো লোক হলে (বয়স দ্বারা) তার নেক আমল বৃদ্ধি হতে পারে। আর খারাপ লোক হলে সে তওবা করার সুযোগ পাবে। (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষ নিজের যোগ্যতা ও আমলে নয়, বরং মহান আল্লাহর রহমতেই মুক্তি পেতে পারে। মুমিনের একমাত্র সম্পদ আল্লাহর রহমত। আল্লাহর রহমতের আশাই আমাদের পাথেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। সন্দেহ নেই, আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু। (সুরা জুমার ৫৩)
তবে মনে রাখতে হবে, নিজের সাধ্যটুকু বিলিয়ে দিয়ে আশা পোষণ করতে হবে। বীজ বপন না করে চারাগাছের আশা করা যেমন নির্বুদ্ধিতা, তেমনি নেক আমল না করে, গুনাহ না ছেড়ে এবং তওবা না করে পরকালীন মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর রহমতের আশায় বসে থাকাও বোকামি। আবার অনেক নেক আমল করে তা নিয়ে অহংকার করা আরও বড় বোকামি। কারণ সর্বপ্রথম অহংকার করেছিল অভিশপ্ত শয়তান। অহংকার করে সে চিরদিনের জন্য আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কাজেই মানুষের মধ্যে অহংকারী মনোবৃত্তি শয়তানি চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের চরিত্র মানুষের জান্নাতে যাওয়ার পথকে বন্ধ করে দেয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে সরিষার দানা (সামান্যতম) পরিমাণও অহংকার আছে, সে (প্রথম পর্যায়েই) জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং যার অন্তরে সরিষার দানা (সামান্যতম) পরিমাণ ইমান আছে সে জাহান্নামে (স্থায়ীভাবে) প্রবেশ করবে না। (ইবনে মাজাহ)
মহান আল্লাহর রহমত কোনো নিষ্ক্রিয় বস্তু নয় যে তা এমনিতেই আমাদের ওপর বর্ষিত হবে। এটি অর্জনের জন্য প্রয়োজন সক্রিয় প্রচেষ্টা। মহান আল্লাহ আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন। আমরা চাইলে তার সাহায্য নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে পারি, আবার চাইলে তাকে ছাড়াও চলতে পারি। কিন্তু আল্লাহকে ছাড়া জীবনের কোনো সার্থকতা বা উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। যিনি এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করছেন, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদি আমরা তার দিকে ফিরে আসি, তবে তিনিও আমাদের দিকে ফিরবেন। তবে এই ফিরে আসাটা হতে হবে পূর্ণাঙ্গ। কেবল মুখে দোয়া নয়, বরং কাজ-কর্মে, উপার্জনে এবং সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে, আমরা তার রহমতের যোগ্য।
জীবনের উদ্দেশ্য কেবল ব্যক্তিগত সুখ নয়, বরং সামগ্রিক কল্যাণ। যখন আমরা অন্যের দুঃখ মোচনে এগিয়ে আসব, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হব এবং নিজেদের জীবনকে হারামের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখব, তখনই আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস ইবাদতে পরিণত হবে। সেই সার্থক জীবনের পথেই রয়েছে আল্লাহর অবারিত রহমত ও শান্তি।
আল্লাহর রহমতই মুমিনের জীবনের শেষ আশ্রয়। আমল মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দেয় আল্লাহর রহমত। এই উপলব্ধি মানুষকে একদিকে যেমন নিরাশা থেকে রক্ষা করে, তেমনি অহংকার থেকেও বাঁচিয়ে রাখে। যে ব্যক্তি নিজের সামান্য আমল নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে, সে মূলত নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে। কারণ সে ভুলে যায়, আল্লাহ চাইলে বিনা আমলেও কাউকে ক্ষমা করতে পারেন, আবার চাইলে পাহাড়সম আমলকেও মূল্যহীন করে দিতে পারেন। এ জন্যই একজন সচেতন মুমিন নিজের আমলকে কখনোই যথেষ্ট মনে করে না। সে জানে, তার ইবাদতে ত্রুটি আছে, নিয়তে খুঁত আছে, আচরণে সীমাবদ্ধতা আছে। এই উপলব্ধিই তাকে বারবার তওবার পথে ফেরায়। একই সঙ্গে সে অন্যের আমল বিচার করার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেয় না। বরং নিজের সংশোধনেই মনোযোগী থাকে। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষকে কর্মবিমুখ করেনি, আবার কর্মের অহংকারেও ডুবিয়ে দেয়নি। বরং শেখায় বিনয়, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর প্রতি গভীর নির্ভরতা। যদি মানুষ এই শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারে, তবে তার প্রতিটি আমল হবে আরও আন্তরিক, তার প্রতিটি দোয়া হবে আরও গভীর, আর তার জীবন হয়ে উঠবে আল্লাহর রহমত লাভের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক