‎১৩ ফেব্রুয়ারি: যেদিন একদলে খেলেছিল ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা

আজ থেকে ঠিক ৩০ বছর আগে, ১৯৯৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ক্রিকেট বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সংহতির সাক্ষী হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ এবং নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সফর বাতিলের মুখে দ্বীপরাষ্ট্রটির পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রতিবেশী দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ— ভারত ও পাকিস্তান। কলম্বোর খেত্তারামা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম) আয়োজিত সেই সংহতি ম্যাচে ভারত ও পাকিস্তানের সেরা ক্রিকেটাররা একই একাদশে মাঠে নেমেছিলেন।



‎সন্ত্রাসের ছায়া ও ক্রিকেটীয় সংকট



‎১৯৯৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে, ৩১ জানুয়ারি কলম্বোর সেন্ট্রাল ব্যাংকে এলটিটিইর  ভয়াবহ বোমা হামলায় ৯১ জন নিহত এবং প্রায় ১৪০০ মানুষ আহত হন। এই ঘটনার পর নিরাপত্তা শঙ্কায় অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। যৌথ আয়োজক হিসেবে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ আয়োজন যখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে, তখনই দক্ষিণ এশীয় ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় ভারত ও পাকিস্তান।


‎'ভারত-পাকিস্তান সংহতি একাদশ'


‎শ্রীলঙ্কা যে ক্রিকেটের জন্য নিরাপদ, তা বিশ্বকে প্রমাণ করতে দুই দেশের বোর্ড দ্রুত একটি যৌথ দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কলকাতা থেকে কলম্বো উড়ে আসা সেই দলে কোনো দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড় ছিলেন না, বরং ছিলেন সমসাময়িক ক্রিকেটের মহাতারকারা: অধিনায়ক: মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন (ভারত), বোলার: ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিস (পাকিস্তান), অনিল কুম্বলে ও আশীষ কাপুর (ভারত), ব্যাটার: শচীন টেন্ডুলকার ও অজয় জাদেজা (ভারত), সাঈদ আনোয়ার ও ইজাজ আহমেদ (পাকিস্তান)



‎ম্যাচের সংক্ষিপ্ত বিবরণ



‎মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে আয়োজিত এই প্রদর্শনী ম্যাচে গ্যালারিতে প্রায় ১০,০০০ দর্শক উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে ব্যাট করে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা ৪০ ওভারে ১৬৮/৯ রান সংগ্রহ করে। ভারতের অনিল কুম্বলে একাই নেন ১২ রানে ৪ উইকেট। শচীন টেন্ডুলকারের সর্বোচ্চ ৩৬ রানের সৌজন্যে ভারত-পাকিস্তান একাদশ অনায়াসেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। শচীনকে আউট করেছিলেন লঙ্কান স্পিন জাদুকর মুত্তিয়া মুরালিধরন।


‎ম্যাচটি কেবল একটি খেলার জয়-পরাজয় ছিল না, বরং এটি ছিল দক্ষিণ এশীয় ঐক্যের প্রতীক। লঙ্কান কিংবদন্তি সানাথ জয়াসুরিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, "সেই ম্যাচটি আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে কলম্বো নিরাপদ।" এই সমর্থন শ্রীলঙ্কাকে মানসিকভাবে এতটাই শক্তিশালী করেছিল যে, পরবর্তীতে তারা সেই ১৯৯৬ বিশ্বকাপেরই শিরোপা জিতে নেয়। ফাইনাল জয়ের পর লাহোরের রাস্তায় পাকিস্তানি সমর্থকদের উল্লাস ছিল দেখার মতো, যেন শ্রীলঙ্কা নয়, পাকিস্তানই জিতেছে।

‎আজ ৩০ বছর পরও শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে এই দিনটি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরিতা ছাপিয়ে ক্রিকেটের মাধ্যমে যে ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ সেদিন তৈরি হয়েছিল, তা ক্রীড়া ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

‎জয়াসুরিয়া সেই বিশেষ ম্যাচের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন: ​"আমার পরিষ্কার মনে আছে, আমাদের জন্য চেন্নাইয়ে একটি যাত্রীবাহী বিমানকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়েছিল। আমি জানি না তাদের অনেক খেলোয়াড়ের কাছে শ্রীলঙ্কায় ঢোকার পাসপোর্ট ছিল কি না, কিন্তু আমাদের সরকার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।"

‎​পাকিস্তানের তৎকালীন অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম এই উদ্যোগের গুরুত্ব নিয়ে বলেছিলেন:
‎​"এটি আমাদের সব দেশের জন্যই একটি বড় প্রাপ্তি। আমি ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কাকেও সাথে নিয়ে এমন যৌথ দলের সাথে খেলার প্রত্যাশা করি।"