গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা

অনন্যসাধারণ এক গন্তব্যে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। সংসদীয় শাসন কাঠামোর গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে প্রথম হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তারা বেসরকারি ঘোষণায় ২১২টি আসন পেয়েছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জোট জামায়াত পেয়েছে ৭৬, অন্যরা ৯ আসনে বিজয়ী হয়েছে। এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দুটি সত্য প্রকাশ পেল। এক. ভোট সুষ্ঠু হলে মানুষ তার অধিকার প্রয়োগে যোগ্য প্রার্থী ও দলকে নির্বাচিত করতে পারে। এটাই গণতন্ত্রের বিজয়। দুই . স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তিত সংযত ও নৈতিক আচরণ মানুষ ইতিবাচক বলে অনুমোদন করেছে। এই অনুমোদন জনআকাক্সক্ষারই নিয়ামক শক্তি হিসেবে দেখা দিল। আমরা অভিনন্দন জানাই সব পক্ষকে এই অভূতপূর্ব ইতিহাস রচনার জন্য। তারেক রহমান হতে যাচ্ছেন সরকারপ্রধান। আর তিনি যদি দলীয় প্রধানের পদে থাকেন তাহলে অন্য কেউ হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। আবার এর উল্টোও হতে পারে। দলীয় প্রধানের দায়িত্ব অন্য একজনের কাঁধে অর্পিত হতে পারে। ইতিবাচক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করতে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার রাজনৈতিক ও সরকারি দায়িত্ব এখন তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে। তিনি ইতিমধ্যেই তার দলীয় মেনিফেস্টোর মাধ্যমে জানিয়েছেন রোডম্যাপ। এবং অঙ্গীকার করেছেন, এই পথ ধরেই অগ্রসর হবেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার অনন্য দৃঢ়তা যেমন দেখিয়েছেন, তেমনি ইসি ও সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক সহযোগ এই উত্তরণের পথ নির্মাণ করেছে।

এবার জাতীয় সংসদ এককেন্দ্রিক হবে না। সংবিধান সংশোধনের পর উচ্চকক্ষ হলে, আসন অনুপাতে সদস্যরা সুযোগ পাবেন। ধারণা করি, সেই উচ্চকক্ষের প্রার্থীরা উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রজ্ঞাবানদের সমন্বয়ে রচিত হবে। গোটা সংসদ যেন দেশের আপামর জনগণের প্রতীক হতে পারে, জনগণের প্রয়োজন ও ইচ্ছার অনুবর্তী হয়, কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে, সেটাই প্রত্যাশা। আর সেই জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এই আকাক্সক্ষার পথ যদি সংসদ পাস করে নেয়, তাহলেই তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে সব দল ও পথের। আমরা সবার মিলিত উচ্চকিত সংসদ আশা করি। সেই সংসদের কার্যক্রম বহুদলীয় গণতন্ত্রের মৌলিক চিন্তার সুফল যেন ফুল্ল হয়ে ওঠে, সেটা মনে রাখতে হবে সরকারি ও বিরোধী দলকে। সাংসদদের দলগত স্বার্থ, জাতীয় প্রয়োজনের বিরুদ্ধে যেন মাথা না তোলে, সেটা মনে রাখার আহ্বান জানাই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ও মিডিয়ার স্বাধীনতা যেন যুক্তিনির্ভর ও সহনশীল হয়, সেটাও আচার-আচরণে প্রদর্শন করার আহ্বান জানাতে চাই।

দেশ পুনর্গঠনে সরকারি ও বিরোধী রাজনীতিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকার বিকল্প নেই। কেননা, দেশ ও জনগণ তাদের। ভোট দিয়ে সংসদে পাঠানোর পেছনে আছে বহুদলীয় চিন্তার রূপরেখা দেখার জন্য। অর্থবহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটাই বড় সুযোগ। তারা যদি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করেন, তাহলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে স্বৈরাচারী চিন্তা, যার অপশাসন আমরা দেখেছি বিগত সরকারের সময়ে। ভূমিধস বিজয় দলকে প্ররোচিত করতে পারে, উসকে দিতে পারে প্রতিপক্ষ ও বিরোধী ক্ষুদ্র দলের প্রতি অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিতে, নতুন প্রধানমন্ত্রীকে সে ব্যাপারে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, তারেক রহমান সেই কুৎসিত ও অগ্রহণযোগ্য পথে হাঁটবেন না। তার দেওয়া রাজনৈতিক রোডম্যাপ যেন প্রশাসনিক রোডম্যাপে পরিণত হয়, সেই ভরসা জাতি প্রত্যাশা করে। নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রথমবার বিজয়ী হয়ে তিনি যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন, তেমনি প্রথম দলীয় প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেন দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্রোত নির্মাণ করতে পারেন, সেজন্য জাতি অপেক্ষা করছে। অভিনন্দন তারেক রহমান, আপনি এবং বিএনপিকে।