দেশের পাঁচ জেলায় নির্বাচন-পরবর্তী সংঘর্ষে অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী, যশোর ও দিনাজপুরে এসব ঘটনা ঘটে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা সংকটজনক। দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত :
মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের জেলা সদরে নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিপক্ষের হামলায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। তার নাম জসিম নায়েব (২৮)। গতকাল শুক্রবার বিকেলে জেলা সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চরআব্দুল্লাহ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জসিম নায়েব মাফিক নায়েবের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, নির্বাচনে জসিম ও তার পরিবারের লোকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মহিউদ্দিনের (ফুটবল) পক্ষে কাজ করেন। নির্বাচনে ফুটবল প্রতীক পরাজিত হলে এদিন বিকেল ৩টার দিকে একই গ্রামের প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা করে জসিমকে এলোপাতাড়ি পেটায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন।
কিশোরগঞ্জ : গতকাল বেলা ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে (নিকলী এবং বাজিতপুর উপজেলা) বিজয়ী প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ও পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুর ইউনিয়নের হুমায়ুনপুর গ্রামের এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে চারজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে শেখ মজিবুর রহমান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পান। তিনি আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার হাঁস প্রতীকের কাছে ১৩ হাজার ১৫৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা।
মেহেরপুর : মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে জামায়াতে ইসলামীর তিন কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল সকালে উপজেলার জোড়পুকুরিয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন জোড়পুকুরিয়া গ্রামের দুই ভাই উজ্জ্বল হোসেন (৩০) ও মাসুদ রানা (৪৫) এবং জুয়েল রানা (২৮)। উজ্জ্বলের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্য দুজন গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। মেহেরপুর-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেনকে প্রায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী নাজমুল হুদা। এই জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করেই এলাকায় উভয় দলের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঝিনাইদহ : জেলায় পাঁচটি সহিংসতায় অন্তত ২৬ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প, সমর্থকদের বাড়িঘর ও প্রেস ক্লাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। শৈলকুপা, ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর ও কালীগঞ্জে এসব পাল্টাপাল্টি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, ভোটের দিন সকাল ৯টার দিকে শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেনি ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে বিএনপির নেতা মধু মোল্লা ও তপনের সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হন। এ ছাড়া গতকাল বেলা ১১টার দিকে কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ডের বাজার রোডে ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলামের নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা পর ভাঙচুর করা হয়। এ সময় খোকন, ইভন ও জবেদ আলী নামের বিএনপির তিন নেতাকর্মীকে পিটিয়ে জখম করা হয়। একই সময়ে সদর উপজেলার নলডঙ্গা ইউনিয়নের ভিটশ্বর গ্রামে কাপ-পিরিচ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে ধানের শীষের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পাঁচজন আহত হন।
গতকাল সকালে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চণ্ডিপুর বাজারে আবদুল কুদ্দুস নামের এক জামায়াতের কর্মীকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এর আগে বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহের প্রেস ক্লাব মহেশপুর কার্যালয় ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা।
পটুয়াখালী : জেলার বাউফল উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সকাল সোয়া ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কালাইয়া বন্দর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আয়নাবাজ কালাইয়া গ্রামে রমিজ দরজি নামের এক বিএনপি কর্মীর বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ায় সকালে কালাইয়া গ্রামে শাহ আলম (৪৬) নামের এক ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালায় স্থানীয় যুবদলের একাধিক কর্মী। পরে তারা সেলিম (৫২) নামের এক কাঠ ব্যবসায়ীকে মারধর করেন। এরপর তারা যান উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গাজী গিয়াস উদ্দিনের। খবর পেয়ে সেখানে এসে জামায়াতের স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা একত্র হয়ে গিয়াস উদ্দিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করেন।
এদিকে গতকাল সকাল ৮টার দিকে কনকদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বীরপাশা খায়েরবাজার এলাকায় আলমগীর গাজী (৫৫) ও শাহাবুদ্দিন সরদার (৪৮) নামের দুই বিএনপির কর্মীকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গতকাল দুপুর ১টার দিকে কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামে মো. ফিরোজ (৫৫) নামের জামায়াতের এক সমর্থককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) বলেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পছন্দ করেন না। তার কোনো কর্মী-সমর্থক হামলা ও মারামারির ঘটনায় জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর : জেলার বিরামপুর উপজেলায় ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং জামায়াতের এক নেতার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল ও গতকাল সকালে বৈদাহার ও ধানঘরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ইব্রাহিম আলী (বাবু) ও জামায়াতের কর্মী মিজানুর রহমান আছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।