রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে বিএনপির হাতছাড়া হয়েছে পাঁচটি আসন। এ জেলার ছয়টি আসনের পাঁচটিই এখন জামায়াত ইসলামীর দখলে। সারা দেশে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় পেলেও যশোরে মাত্র একটি আসনে (সদরে) জয় পেয়েছেন সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, তিনটি আসনে প্রার্থী বদল, একটি আসনে জনপ্রিয় নেতার ঋণখেলাপীর বিষয়টি সামনে এনে মনোনয়ন বাতিলসহ কিছু কারণে তৃণমূলে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এতে ওইসব আসনে ফলাফলে প্রভাব পড়েছে।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রথমে বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেয়া হয়। মনোনয়ন পেয়ে তিনি কর্মী-সমর্থক নিয়ে প্রায় দেড় মাস গ্রামে গ্রামে ভোটারদের কাছে যান। বিপরীতে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মাঠে নামেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন ও সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর কর্মী-সমর্থকরা। এক পর্যায়ে নুরুজ্জামান লিটন চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এরপর মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও হাসান জহিরের সমর্থকরা অভিমানী হয়ে ওঠেন। দলের একাংশের নেতাদের ধারণা ছিল, মফিকুল হাসান তৃপ্তির মনোনয়ন পরিবর্তন করা হলে ভাগ্য খুলতে পারে হাসান জহিরের। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় নুরুজ্জামান লিটনের। ফলে দলের একাংশের নেতাকর্মীদের মনে অভিমান-ক্ষোভ থেকেই গেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং বিএনপির নিশ্চিত এই আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায়।
জানতে চাইলে খায়রুজ্জামান মধু বলেন, আমার মুখ দিয়ে এসব বলাইয়েন না। আপনারা তো কমবেশি খবর রাখেন। পরে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমি আমার ভক্ত-সমর্থকদের ধানের শীষের কথা বলেছি। প্রার্থীর সাথে ভোটও করেছি।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বিএনপির ৫ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শুরুতে সাবিরা সুলতানাকে মনোনয়ন দেয়া হলেও তা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেন অন্য তিন নেতা ও তাদের সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল হক বিদ্রোহী প্রার্থী হন। যদিও পরে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি সরে দাঁড়ান। কিন্তু ততক্ষণে ব্যালটে থেকে যায় তার নাম। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, সাবিরা সুলতানার পাশে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের সেভাবে দেখা যায়নি। দুই-একদিন লোকদেখানো মিটিংয়ে থাকলেও ভোটে কার্যত ভূমিকা প্রত্যাশিত নয় বলে দাবি অনেকের। ফলে এ আসনটিও বিএনপির হাতছাড়া হয়।
জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইউনুস আলী বলেন, অস্বীকার করার উপায় নেই যে মনোনয়ন পাওয়া-না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনের আগে যা হয়েছে সেটা ভোটের মাঠে কঠিন প্রভাব ফেলেছে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে শুরুতে এখানে তৃণমূলের আস্থাভাজন নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাঘারপাড়া ও অভয়নগর বিএনপির একাংশ তার ব্যবসায়িক ঋণের বিষয়টি সামনে এনে মনোনয়নপত্র বাতিল করায়। এরপর বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মতিয়ার রহমান ফারাজী মনোনয়ন পান। কিন্তু ভোটের দিন দেখা যায়, টিএস আইয়ুবের সমর্থকরা বাঘারপাড়ার সন্তান হিসেবে জামায়াত নেতা গোলাম রছুলকে ভোট দিয়েছেন। ফারাজী নিজের কেন্দ্রেই বিজয় নিশ্চিত করতে পারেন নি।
যশোর-৫ মনিরামপুর আসনে পরাজয়ের জন্য দলের সিদ্ধান্তকে দুষছেন নেতাকর্মীরা। প্রথমে এখানে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। এখানে একক প্রার্থী ঘোষণায় মাঠে নামে বিএনপি। তৃণমূলের প্রত্যাশা অনুযায়ী শহীদ ইকবালকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বিএনপি জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি আব্দুর রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করেন। মেনে না নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল। তাকে দল বহিস্কার করলেও কাজ হয়নি। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী তার সাথে ছিলেন। ফলাফলে এ আসনে ধানের শীষের অবস্থান তৃতীয়। বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে। কিন্তু গত ২৪ ডিসেম্বর হঠাৎ শ্রাবণকে বাদ দিয়ে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হন তৃণমূলের কর্মীরা। অবশ্য রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ দলের পক্ষে মাঠে থাকলেও ঘরে উঠেনি বিজয়।
জানতে চাইলে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, জেলার অন্য পাঁচটি আসনে হারার বিষয়ে জানার চেষ্টা করছি। সব তথ্য জেনে মন্তব্য করবো।