তামিল টাইগারদের আত্মসমর্পণের পর, কলম্বো জুড়ে এতটা নিরাপত্তাবেষ্টনি গত দেড় যুগে দেখা যায়নি। এমন নয় যে ভারত ও পাকিস্তান কখনোই মুখোমুখি হয়নি সিংহল দ্বীপে। বছর দুই আগেও এশিয়া কাপের সুপার ফোরের ম্যাচে দেখা গিয়েছিল দুই বৈরি প্রতিবেশীর দ্বৈরথ। তাতে পাকিস্তানের ২২৮ রানের হার ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছিল উত্তেজনার মশাল। কিন্তু এবারের হিসেবটা আলাদা। কারণ তখন ওয়াঘা সীমান্তের দুই ধারে উত্তেজনা থাকলেও ‘অপারেশন সিঁদুর’ আর ‘অপারেশন বুনিয়ান আন মারসুস’ ঘটেনি। রাজনীতি দিল্লী আর ইসলামাবাদের মসনদ ছাপিয়ে ক্রিকেটে এতটা সংক্রমিত হয়নি যে দুই দলের ক্রিকেটাররা খেলা শেষে একে অন্যের সঙ্গে হাত মেলাবেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই দলের সাবেক ক্রিকেটারদের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশও দেখা যায়নি। তাই অনেক নাটকীয়তার পর কলম্বোতে টি-২০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচটাকে ঘিরে রীতিমত সীমান্ত সংঘাতেরই উত্তাপ।
নামিবিয়াকে নাচিয়ে শুক্রবার মধ্যরাতে শ্রীলঙ্কায় পা রেখেছে ভারত। হাইব্রিড মডেল নামের অদভুত এক ব্যবস্থায় বিশ্বকাপের প্রধান স্বাগতিককে খেলতে আসতে হয়েছে আরেক সহ-স্বাগতিক দেশে, কারণ ভারত ও পাকিস্তান কেউ কারো দেশেই পা রাখে না। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ না হওয়াতে কেবল মাত্র আইসিসি আর এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) এর ইভেন্টেই এই দুই দলকে মুখোমুখি হতে দেখা যায়, যে বিরলত্বের সুযোগে বিপননকারীরা এই ম্যাচের বাণিজ্যিক মূল্যকে আকাশে তুলেছেন। অথচ গত ১০ বছরে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে ১৭ বার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই দল, বরং আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ যদি এই দুই দলকে সাদা পোষাকে মুখোমুখি করতে পারে কিংবা ফাইনালে এই দুই দল মুখোমুখি হয়ে যায় তাহলে সেটাই হবে ক্রিকেট জগতের কোহিনূর। কারণ ২০০৭ সালের বেঙ্গালুরু টেস্টের পর এই দুই দল কখনো পাঁচদিনের ক্রিকেটে মুখোমুখি হয়নি।ভাবা যায়, বিরাট কোহলি তার টেস্ট ক্যারিয়ারে পাকিস্তানের বিপক্ষে কোন টেস্ট ম্যাচ খেলেননি!
যাক সে কথা, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশপ্রেমের পাঁচন গেলানোর যুগে ক্রিকেটের শুদ্ধতার জলাঞ্জলী ঘটেছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট যেন সেই প্রাচীন রোমের গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই। মাঠভর্তি মানুষ চোখের সামনে দেখতে চায় প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে বিজয়ী। উপমহাদেশের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট সংস্কৃতিতেও আলাদা, নিজের দেশের খেলা বাদে অন্য দলের ম্যাচ নিয়ে তাদের খুব বেশি আগ্রহ নেই। তার উপর শ্রীলঙ্কা নিজেও বিশ্বকাপে খেলছে, তারা আছে অন্যগ্রুপে। এই ম্যাচ নিয়ে তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই। কিন্তু দলে দলে লোকজন এসেছে মধ্যপ্রাচ্য, ভারত আর পাকিস্তান থেকে। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে শ্রীলঙ্কায় সাধারণ সময়ের চেয়ে ২০% পর্যটক বেশি এসেছে এই ম্যাচকে ঘিরে। ফ্লাইট, টিকিট, ৫ তারকা হোটেলে আবাসন মিলিয়ে একেকজন পর্যটক ১৫০০-২০০০ ডলার খরচ করছেন। ৩৫০০০ ধারণ ক্ষমতার প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের সব টিকিট বিকিয়ে গেছে, দর উঠেছে স্থানীয় মূদ্রায় আড়াই লাখ রুপি অবধি। অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন, এই ম্যাচটা টিভিতে সবচেয়ে বেশি লোকের দেখা কোন ক্রিকেট ম্যাচ হতে যাচ্ছে। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছিল ৫৮০ মিলিয়ন মানুষ, তখন তো হাতে হাতে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের লাইভ স্ট্রিমিং প্রযুক্তি আসেনি। এবারে সংখ্যাটা ৬০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা, তাই টিভি সম্প্রচারে প্রতিটা সেকেন্ড বিক্রি হচ্ছে হীরের দামে!
পাকিস্তান সরকার প্রথমে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা খেলতে অস্বীকৃতি জানালেও আইসিসি’র তৎপরতা ও অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ডের প্রধানদের পিসিবি প্রধানকে অনুরোধের পর অবশেষে সিদ্ধান্ত বদল করে পাকিস্তান সরকার। তাই আশঙ্কা উড়িয়ে দুই দল মাঠে নামতে প্রস্তুত। তবে বাগড়া দিতে পারে প্রকৃতি। আবহাওয়া পূর্বাভাষের ওয়েবসাইট আকুওয়েদার জানাচ্ছে, আজ সন্ধায় কলম্বোতে বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। বিকেল ৫টায় বৃষ্টির সম্ভাবনা ৪৫% এরপর প্রতি ঘন্টায় ৫% করে কমবে। তাই এত আয়োজন আর কাঠখড় পোড়ানো ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ব্যপার হচ্ছে, এই ম্যাচটায় হারজিতে কারো কোন ফারাকই পড়বে না! এমন একটা গ্রুপে আইসিসি ইচ্ছে করেই দুই দলকে রেখেছে এবং দুটো করে ম্যাচ হয়ে যাবার পর পয়েন্ট টেবিলের যা অবস্থা, তাতে করে সুপার ৮ পর্বে ভারত ও পাকিস্তান দুই দলই উত্তীর্ণ হবে। টুর্নামেন্টের ফিক্সিড সিডিং পদ্ধতি অনুযায়ী ভারত পরের পর্বে উঠলেই হবে এ-ওয়ান, পাকিস্তান হবে এ-টু। তাই হারজিতেও টুর্নামেন্টে টিকে থাকা বা না থাকা, কঠিন প্রতিপক্ষকে এড়ানো বা সহজ গ্রুপ পাওয়া এসবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। তবুও এই ম্যাচকে ঘিরে এত উত্তেজনা, এত আবেগের প্রবাহ, যে ম্যাচের ফলের চেয়ে সবার চোখ ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের হাত মেলানো নিয়ে।