প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-এমপিদের মিলবে যেসব সুযোগ-সুবিধা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি ও তার শরিকদল। দলটি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।

ভোটগ্রহণ স্থগিত হওয়া একটি আসনসহ মোট তিনটি আসন ছাড়া বাকি সব আসনের সংসদ সদস্যরা আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথগ্রহণ করবেন। শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হবে নতুন সংসদের। এরপরই সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্য উন্মোচিত হবে নানা সুযোগ-সুবিধা।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এবং বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক পদের বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয় আইনের মাধ্যমেই। সময়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় আইন সংশোধন করে এই বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী এবং স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের বেতন-ভাতা বাড়াতে সংসদে আইন পাস হয়। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই পদধারীদের আর্থিক সুবিধাগুলোকে বেতন-ভাতা না বলে ‘সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধা’ (রেমুনারেশেন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

‘দ্য মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদাক্রম অনুযায়ী চিফ হুইপ এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করেন। অপরদিকে হুইপরা পান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা।

প্রধানমন্ত্রীর বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা
দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মাসিক বেতন পান ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ টাকা, তবে সরকারি বাসভবনে বসবাস করলে এই ভাড়া তিনি পান না। এছাড়া দৈনিক ভাতা হিসেবে পান ৩ হাজার টাকা। বিমান ভ্রমণের জন্য বিমা কভারেজ রয়েছে ২৫ লাখ টাকার। স্বেচ্ছাধীন তহবিল হিসেবে তিনি পান দেড় কোটি টাকা।

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের বেতন-ভাতা
একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মাসিক বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রীর বেতন ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীর বেতন ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। দায়িত্ব পাওয়ার পর একজন মন্ত্রী সরকারি ব্যয়ে একটি সুসজ্জিত বাসভবন পেয়ে থাকেন বিনা ভাড়ায়। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরাও একই সুবিধা ভোগ করেন।

কোনো মন্ত্রী যদি সরকারি বাসভবনে না থেকে নিজস্ব বা ভাড়া বাড়িতে থাকতে চান, সেক্ষেত্রে সরকার থেকে মাসিক ৮০ হাজার টাকা করে ভাড়া পাবেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা এই খাতে পাবেন ৭০ হাজার টাকা করে। নিজ বাড়ি বা ভাড়া বাড়িতে বসবাস করলে বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে আরও তিন মাসের বাড়ি ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা দেওয়া হয়।

এলাকার উন্নয়নে বরাদ্দ নিরীক্ষামুক্ত
নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন, মসজিদ-মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার এবং দাতব্য কাজে একজন মন্ত্রীকে বছরে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। প্রতিমন্ত্রী পান সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং উপমন্ত্রী পান ৫ লাখ টাকা। এই তহবিল থেকে মন্ত্রী চাইলে একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা দিতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী দিতে পারেন ৩৫ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী দিতে পারেন ২৫ হাজার টাকা। বিশেষ করে এলাকার উন্নয়নে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের এই টাকার কোনো নিরীক্ষা না থাকায় এ খাতে খরচে তারা অনেকটাই উদার থাকেন।

আপ্যায়ন ও চিকিৎসা খরচ
মন্ত্রী হওয়ার পর দপ্তরে দেশি-বিদেশি সৌজন্য সাক্ষাৎকার ও এলাকাবাসীর দেখা-সাক্ষাৎ লেগেই থাকে। তাদের আপ্যায়নের জন্য মন্ত্রী পান মাসে ১০ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রী পান সাড়ে ৭ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রী পান ৫ হাজার টাকা।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা অসুস্থ হলে তাদের পূর্ণ চিকিৎসা খরচ বহন করে সরকার। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচ সীমাহীন, তবে খরচের ভাউচার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিতে হবে। বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী বছরে ১০ লাখ টাকার বিমা সুবিধা পাবেন।

বাড়ি, গাড়ি ও অন্যান্য সুবিধা
দায়িত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী সরকারি খরচে একটি করে গাড়ি পাবেন। এই গাড়ি সরবরাহ করে পরিবহন পুল। সরকারি প্রয়োজনে ভ্রমণের সময় তারা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যেকোনো সংস্থা বা দপ্তর থেকে একটি জিপ গাড়ি পাবেন। জ্বালানি বাবদ দৈনিক ১৮ লিটার জ্বালানি তেলের সমপরিমাণ অর্থ পান তারা।

দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দৈনিক ভাতা পান ২ হাজার টাকা করে, উপমন্ত্রী পান দেড় হাজার টাকা করে। সরকারি বাসভবন সাজসজ্জার জন্য প্রতিবছর মন্ত্রী পান পাঁচ লাখ টাকা, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পান চার লাখ টাকা করে। এছাড়া বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও টেলিফোন বিল পুরোপুরি বহন করে সরকার।

মন্ত্রীর জন্য ১০ জন সহায়ক কর্মচারী বরাদ্দ থাকে। এর মধ্যে উপসচিব পদমর্যাদার একান্ত সচিব (পিএস), একজন সহকারী একান্ত সচিব, সরকারি কর্মকর্তার বাইরে নিজ পছন্দের একজন সহকারী, দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, একজন জমাদার, একজন আরদালি, দুইজন অফিস সহায়ক ও একজন পাচক বা বাবুর্চি রয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা পান একজন একান্ত সচিব, একজন ব্যক্তিগত সহকারী, একজন জমাদার, একজন আরদালি ও একজন অফিস সহায়ক।

মন্ত্রী পদমর্যাদায় চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় নেতা
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, চিফ হুইপ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা সরকারি বাসা, একান্ত সচিব (পিএস), সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস), দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, একজন বাহক, দুজন অফিস সহায়ক ও একজন পাচক পান। এছাড়া আটজন পুলিশ সদস্য ও দুজন গানম্যানের সুবিধাও দেওয়া হয় তাকে। অপরদিকে হুইপরা পান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও সুবিধা।

সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা
একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের মাসিক বেতন ৫৫ হাজার টাকা। সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা পান। নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত ভাতা হিসেবে প্রতি মাসে পান ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সম্মানী বা আপ্যায়ন ভাতা প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা। মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০ হাজার টাকা এবং নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতি মাসে পান ১৫ হাজার টাকা।

এছাড়া লন্ড্রি ভাতা দেড় হাজার টাকা, ক্রোকারিজ ও টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬ হাজার টাকা, মসজিদ-মন্দির উন্নয়নে বছরে ৫ লাখ টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতিমাসে ৭ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়া হয়। তার সব ভাতা সম্পূর্ণ করমুক্ত। একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা যে চিকিৎসা খরচ পান, একজন সংসদ সদস্য ও তার পরিবারও সমান সুবিধা পাবেন।