১৯২৩ সালে তুতানখামুনের সমাধি উন্মোচন কেবল এক প্রত্নতাত্ত্বিক সাফল্য নয়, বরং এটি প্রাচীন মিসরের ইতিহাস পুনর্গঠন ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার এক নতুন দিগন্ত। সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কার নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর ক্ষণ
নীলনদের পশ্চিম তীরে রাজাদের উপত্যকা বা ভ্যালি অব দ্য কিংস তখন তপ্ত রোদে পুড়ছে। ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে একটি গোপন সিঁড়ির খোঁজ পেয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার। কিন্তু ইতিহাসের আসল রোমাঞ্চ জমা ছিল ১৯২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির জন্য। সেদিন যখন কার্টার এবং তার পৃষ্ঠপোষক লর্ড কার্নারভন সমাধি কক্ষের শেষ দেয়ালটি ভাঙলেন, তখন যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ভেতরে মশাল নিয়ে উঁকি দিলেন কার্টার। বাইরে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে কার্নারভন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন? কার্টারের গলা দিয়ে তখন শুধু কয়েকটা শব্দই বেরিয়েছিল, হ্যাঁ, চমৎকার সব জিনিস। ধুলোবালির আস্তরণ আর হাজার বছরের জমাট বাঁধা অন্ধকারের ভেতর থেকে ঝিলিক দিয়ে উঠছিল সোনা, মণি-মানিক্য আর প্রাচীন আভিজাত্যের এক অকল্পনীয় জগৎ। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে যে নীরবতা এই সমাধি কক্ষকে আগলে রেখেছিল, কার্টারের একটি হাতুড়ির ঘায়ে তা চুরমার হয়ে গেল। মানব ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হলো এক নতুন মহাকাব্য।
অকালপ্রয়াত ফারাও
তুতানখামুন ছিলেন প্রাচীন মিসরের অষ্টাদশ রাজবংশের একজন ফারাও। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে যখন তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন তার বয়স ছিল বড়জোর ৯ বা ১০ বছর। তার শাসনকাল ছিল মাত্র এক দশকের মতো। ইতিহাসে তিনি কোনো মহান দিগি¦জয়ী বীর বা বিশাল পিরামিড নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। বরং তার পিতা আখেনাতেন যখন মিসরের চিরাচরিত বহুঈশ্বরবাদী ধর্মব্যবস্থা ভেঙে সূর্যদেব আতেনের উপাসনা প্রবর্তন করেন, সেই বিশৃঙ্খল সময়ের পর তুতানখামুন আবার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিশোর বয়সেই তার মৃত্যু হয় এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে তাকে সমাহিত করা হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই অকালপ্রয়াত এবং ঐতিহাসিকভাবে কিছুটা কম গুরুত্বপূর্ণ ফারাওই আজ পৃথিবীর সব থেকে পরিচিত নাম। কারণ তার সমাধিটি চোরদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা মিসরের অন্য কোনো পরাক্রমশালী ফারাওয়ের ক্ষেত্রে ঘটেনি। এই সমাধি আবিষ্কারের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি, একজন সাধারণ ফারাওয়ের শেষ বিদায়েও যদি এত ঐশ্বর্য থাকতে পারে, তবে রামেসিস বা খুফুর মতো সম্রাটদের সমাধিতে কী বিপুল সম্পদ ছিল।
প্রত্নতত্ত্বের সূক্ষ্ম কারিগরি
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রত্নতত্ত্ব বলতে অনেকেই বুঝতেন কেবল মাটির তলা থেকে গুপ্তধন খুঁজে বের করা। কিন্তু হাওয়ার্ড কার্টার এই ধারণা বদলে দিয়েছিলেন। তুতানখামুনের সমাধি আবিষ্কার কেবল ভাগ্যের খেলা ছিল না, ছিল কার্টারের দীর্ঘ দশ বছরের ধৈর্যের ফল। তিনি অত্যন্ত পদ্ধতিগতভাবে পুরো উপত্যকা জরিপ করেছিলেন। যখন সমাধিটি পাওয়া গেল, তিনি তাড়াহুড়ো করে ভেতরের সম্পদ বের করে আনেননি। প্রতিটি ছোট ছোট বস্তু, এমনকি ফুলের মালা বা মাটির পাত্রের অবস্থানও তিনি নিখুঁতভাবে ম্যাপে নথিবদ্ধ করেছিলেন। আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের যে ভিত্তি, অর্থাৎ কোনো ধ্বংসাবশেষকে তার চারপাশের পরিবেশসহ নথিবদ্ধ করা, কার্টার তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই সমাধি থেকে পাওয়া মমি নিয়ে যখন ডিএনএ পরীক্ষা বা সিটি স্ক্যান করা হয়েছে, তখন কার্টারের রাখা সেইসব তথ্য বিজ্ঞানীদের অনেক সাহায্য করেছে। মমি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি তুতানখামুনের শারীরিক অসুস্থতা, তার পায়ের সমস্যা এবং সম্ভবত ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যুর কারণ। প্রত্নতত্ত্ব যে কেবল অতীত খোঁড়া নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া কঙ্কালের ওপর রক্ত-মাংসের ইতিহাস গড়ে তোলার বিজ্ঞান, কার্টারের কাজ তারই প্রমাণ।
উপনিবেশবাদ ও ঐতিহ্যের মালিকানা
তুতানখামুন আবিষ্কারের নেপথ্যে ছিল লর্ড কার্নারভনের অগাধ অর্থ আর ব্রিটিশ রাজের দাপট। বিংশ শতাব্দীর সেই সময়ে মিসরের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর ওপর পশ্চিমা শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কার্টার এবং কার্নারভনের এই অভিযান ছিল মূলত ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত। আবিষ্কৃত বস্তুগুলো কি মিসরের জাদুঘরে থাকবে নাকি লন্ডনের মিউজিয়ামে পাড়ি জমাবে, তা নিয়ে সেই সময়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন মিসরীয় জাতীয়তাবাদীরা তাদের দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে রাজি ছিলেন না। এই আবিষ্কারের ফলে প্রত্নতত্ত্বের নৈতিকতা নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ছিল না, বরং ছিল ক্ষমতার লড়াই। আজকের দিনে যখন আমরা গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়ামে তুতানখামুনের সোনার মুখোশ দেখি, তখন তা কেবল প্রাচীন শিল্পের নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং একটি জাতির নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেও ধরা দেয়।
ফারাওয়ের অভিশাপ
সমাধিটি উন্মোচনের কিছুদিনের মধ্যেই লর্ড কার্নারভনের মৃত্যু এই আবিষ্কারের সঙ্গে এক অলৌকিক ও রহস্যময় মাত্রা যোগ করে। একটি সাধারণ মশার কামড় থেকে হওয়া ইনফেকশনে তার মৃত্যু হলেও সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যম রটিয়ে দেয় যে, ফারাওয়ের সমাধিতে প্রবেশের কারণেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অভিশাপের গল্পটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে সমাধিতে একটি ফলক ছিল যাতে লেখা ছিল যে কেউ ফারাওয়ের শান্তি ভঙ্গ করবে, মৃত্যুর ডানা তাকে গ্রাস করবে। যদিও কার্টার নিজে দীর্ঘকাল বেঁচে ছিলেন এবং বৈজ্ঞানিকভাবে এই অভিশাপের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তবুও সাধারণ মানুষের মনে এই রহস্য আজীবন বেঁচে আছে। সম্ভবত কবরের ভেতর জমে থাকা প্রাচীন ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া লর্ড কার্নারভনের দুর্বল শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়েছিল, কিন্তু মানুষ সবসময়ই যুক্তির চেয়ে রোমাঞ্চকর গল্প বেশি পছন্দ করে। এই অভিশাপের গল্পই তুতানখামুনকে পপ কালচারে এক অমর চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
অক্ষত ঐশ্বর্য
তুতানখামুনের সমাধি থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি বস্তু পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ফারাওয়ের এগারো কেজি ওজনের নিরেট সোনার মুখোশ। কিন্তু ঐতিহাসিকদের কাছে সোনার চেয়েও মূল্যবান ছিল সেখানকার সাধারণ জিনিসগুলো। ছোটবেলায় ফারাওয়ের খেলার সরঞ্জাম, তার পরার চটি জুতো, এমনকি খাবারের অবশিষ্টাংশ পর্যন্ত সেখানে পাওয়া গিয়েছিল। রথ, অস্ত্রশস্ত্র, প্রসাধনী সামগ্রী আর বাদ্যযন্ত্র দেখে বোঝা যায় তিন হাজার বছর আগেকার মিসরীয় জীবন কতটা উন্নত ছিল। তারা বিশ্বাস করত মৃত্যুর পরের জীবনেও মানুষের এইসব পার্থিব জিনিসের প্রয়োজন হবে। এই পরকাল বিশ্বাসই মিসরীয় সভ্যতাকে বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও শৈল্পিক সভ্যতায় পরিণত করেছিল। সমাধি কক্ষের দেয়ালে আঁকা ছবিগুলো থেকে আমরা সেই সময়ের ধর্মীয় আচার এবং রাজা হিসেবে তুতানখামুনের অভিষেক ও বিদায়ের দৃশ্য দেখতে পাই। প্রতিটি নিদর্শন যেন একেকটি কথা বলা ইতিহাস।
সভ্যতার আয়নায় প্রাচীন মিসর
তুতানখামুন আবিষ্কারের ঘটনাটি কেবল মিসরের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে একটি হারানো সভ্যতাকে মাটির তলা থেকে পুনর্জীবিত করা যায়। যেমনভাবে হাইনরিশ শ্লিম্যান ট্রয় নগরী খুঁজে বের করেছিলেন বা হিরাম বিংহাম মাচু পিচু আবিষ্কার করেছিলেন, তুতানখামুন আবিষ্কারও ঠিক তেমনি বিশ্ব ইতিহাসের একটি মাইলফলক। প্রাচীন মিসরীয়দের পিরামিড নির্মাণ শৈলী, তাদের লিখন পদ্ধতি বা হায়ারোগ্লিফিক এবং তাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান আজও আমাদের বিস্মিত করে। তুতানখামুনের সমাধি যেন সেই বিশাল সভ্যতার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যেতে পারে, কিন্তু তাদের সৃজনশীলতা আর বিশ্বাসের গল্প মাটির গভীরে হাজার বছর বেঁচে থাকে। প্রত্নতত্ত্ব হলো সেই জানালা যার মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারি।
আধুনিক বিশ্বে ইজিপ্টোম্যানিয়া
এই আবিষ্কারের পর সারা বিশ্বে মিসরের শিল্প ও সংস্কৃতির এক জোয়ার এসেছিল যাকে বলা হয় ইজিপ্টোম্যানিয়া। আর্ট ডেকো ডিজাইন থেকে শুরু করে ফ্যাশন, জুয়েলারি এমনকি সিনেমার পর্দায় মিসরীয় মোটিফ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হলিউডের হরর মুভি থেকে শুরু করে গোয়েন্দা গল্প সবখানেই ফারাও আর মমির আনাগোনা বাড়তে থাকে। পর্যটন শিল্পে মিসর এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম হয়ে দাঁড়ায়। আজও হাজার হাজার মানুষ কায়রোতে ভিড় করে সেই কিশোর রাজার সোনার মুখোশটি দেখার জন্য। তুতানখামুন আজ কেবল একজন মৃত রাজা নন, তিনি প্রাচীন বিশ্বের এক চিরস্থায়ী দূত। ১৯২৩ সালের সেই মশাল জ্বালিয়ে কার্টার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার আলো আজও মøান হয়নি। ইতিহাসের সেই অন্ধকার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি ধূলিকণা আজও আমাদের নতুন নতুন গল্প শুনিয়ে যায়। অতীত কখনো মরে না, সে কেবল মাটির নিচে অপেক্ষা করে সঠিক মানুষের স্পর্শের জন্য।
সমাধির গোলকধাঁধা ও স্বর্ণগর্ভ প্রকোষ্ঠ
তুতানখামুনের সমাধির স্থাপত্য ছিল এক গভীর রহস্যময় মানচিত্রের মতো, যা মূলত চারটি প্রধান প্রকোষ্ঠে বিভক্ত ছিল। প্রবেশের পর প্রথম কক্ষ বা ‘অ্যান্টিক্যাম্বার’ ছিল দৈনন্দিন বিলাসিতার এক বিশাল ভাণ্ডার, যেখানে রথ থেকে শুরু করে রাজকীয় সিংহাসন স্তূপীকৃত ছিল। এরপরের ‘অ্যানেক্স’ বা অতিরিক্ত কক্ষে ছিল ফারাওয়ের ব্যবহৃত হাজারো ছোটখাটো সামগ্রী। তবে মূল আকর্ষণ ছিল সমাধি কক্ষ বা ‘বেরিয়াল চেম্বার’, যার চারদিকের দেয়ালে আঁকা ছিল ‘আমদুয়াত’ বা পাতালপুরের যাত্রাপথের চিত্র। প্রাচীন মিসরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ছবিগুলো ফারাওকে পরকালের অন্ধকার পথে সূর্যদেবের সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করত। এই কক্ষের ঠিক মাঝখানে ছিল একটি বিশাল পাথরের সারকোফেগাস বা শিলালিপি খচিত কফিন আধার। তার ভেতরে একে একে রাখা ছিল তিনটি স্তরের কফিন। প্রথম দুটি ছিল কাঠের ওপর সোনার কারুকাজ করা, কিন্তু সবার ভেতরে লুকিয়ে ছিল সেই পরম বিস্ময় পুরো ১১০ কেজি নিরেট সোনার তৈরি একটি কফিন, যার ভেতরে ৩ হাজার বছর ধরে রাজকীয় শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিলেন কিশোর ফারাও। এই ত্রিস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা কেবল শরীরকে রক্ষার জন্য নয়, বরং আত্মাকে অনন্তকালের জন্য নিরাপদ রাখতেই নির্মাণ করা হয়েছিল। একবিংশ শতাব্দীতে এসে তুতানখামুনের রহস্য উন্মোচনে প্রত্নতাত্ত্বিকের কোদালের চেয়ে বিজ্ঞানীর মাইক্রোস্কোপ বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো ফারাওয়ের মমিটি সমাধি থেকে বের করে সিটি স্ক্যান করা হয়, যা তার মৃত্যুর আসল কারণ নিয়ে হাজার বছরের জল্পনার অবসান ঘটায়। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে তাকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু স্ক্যান রিপোর্টে দেখা যায় তার হাঁটুতে একটি গভীর ক্ষত ছিল যা পরবর্তী সময়ে মারণঘাতী ইনফেকশনে পরিণত হয়েছিল।