মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এড়াতে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার জেনেভা পৌঁছান। এমন এক সময়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ী সতর্ক করেছেন যে, এই উত্তেজনা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তায় আরাগচি বলেন, ‘আমি একটি ন্যায্য ও সমতাপূর্ণ চুক্তির লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে জেনেভায় এসেছি। তবে চাপের মুখে নতি স্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।’
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের প্রধান পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি চাইছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে বৈঠক শেষে আরাগচি জানান, তার দল একটি ‘গভীর কারিগরি আলোচনার প্রত্যাশা করছে।
তবে ইরান জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরীক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রটোকল প্রয়োজন। এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের অবস্থান আগের চেয়ে কিছুটা ‘বাস্তবসম্মত’ হয়েছে। তবে হামলা হওয়া স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় তিনি গ্রোসির সমালোচনাও করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হাঙ্গেরি সফরকালে বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ আছে এবং আমরা তাকে স্বাগত জানাই। তবে আমি বিষয়টিকে খুব সহজ করে দেখতে চাই না; এটি অত্যন্ত কঠিন হতে যাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র কেবল পরমাণু কর্মসূচি নয়, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন নিয়েও আলোচনা করতে চায়। অন্যদিকে, তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে তারা কোনো আপস করবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো চুক্তি না হয়, তবে আমাদের এটার প্রয়োজন পড়বে।’
কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে সামরিক শক্তি প্রদর্শনও থেমে নেই। গতকাল ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ‘স্মার্ট কন্ট্রোল অব দ্য স্ট্রেইট অব হরমুজ’ নামে একটি সামরিক মহড়া শুরু করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এটি মূলত নৌ ইউনিটের যুদ্ধের প্রস্তুতি যাচাইয়ের একটি মহড়া।
জেনেভা আলোচনায় হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। তবে ইরানি কট্টরপন্থীরা এই আলোচনা নিয়ে সন্দিহান। পার্লামেন্টে কট্টরপন্থী নেতা হামিদ রাসায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেশের অখণ্ডতা এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মধ্যেই এই আলোচনা শুরু হলো। একই সময়ে জেনেভায় ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়েও আলোচনার কথা রয়েছে, যদিও সেখানে আশু কোনো সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র: আল-জাজিরা